খালেদা জিয়াকে নিয়ে ক্ষমতাসীনদের দুশ্চিন্তা

খালেদা জিয়াকে নিয়ে ক্ষমতাসীনদের দুশ্চিন্তা

আলফাজ আনাম


নির্বাচন কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের মধ্য দিয়ে দেশে একধরনের নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। একইভাবে আগামী নির্বাচন কেমন হবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির তেমন কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল না। সভা-সমাবেশ বা মিছিল একরকম বন্ধ হয়ে গেছে। মানববন্ধন আর শোকসভা-জাতীয় কিছু কর্মসূচি পালন করা হলেও তাতে পুলিশ হানা দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান চালানোর ফলে দেশ একধরনের রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল।

দেশের রাজনীতির মাঠ কিভাবে উত্তপ্ত করতে হয় আর কিভাবে বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে কোণঠাসা করতে হয়, তাতে আওয়ামী লীগের চেয়ে অভিজ্ঞতা আর অন্য কোনো দলের আছে বলে মনে হয় না। রাজনীতিতে ইস্যু তৈরি করতে যেমন আওয়ামী লীগ পারঙ্গম, তেমনি একটি ইস্যুকে চাপা দিয়ে আরেকটি ইস্যু তৈরি করতেও আওয়ামী লীগের চেয়ে আর কোনো দল এত দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সাফল্যের কারণ হলো দলটির নিয়ন্ত্রণে সব গণমাধ্যম। দলীয় ভাষ্য গণমাধ্যম দ্রুত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। অপর দিকে ক্যাডার-ভিত্তিক দল না হয়েও দলের নেতাকর্মী এমনকি দলীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত নেতাকর্মীরা দলের বয়ানটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। ফলে কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা তা অনুমান করা সাধারণ মানুষের জন্য দুষ্কর হয়ে ওঠে। তবে অতি আত্মবিশ্বাসী রাজনৈতিক কৌশল অনেক সময় বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সম্প্রতি কক্সবাজার সফর নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য কক্সবাজার যাওয়ার পথে ফেনীতে তার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। খালেদা জিয়া ফেনী পৌঁছার অনেক আগে সকালে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ফেনীর সাথে নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তিনি ফেনী অতিক্রম করার সময় তার গাড়িবহরে সাথে থাকা সংবাদকর্মীদের গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও মারধর করে স্থানীয় নেতাকর্মীরা। কারা এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে, কিভাবে হামলা হয়েছে, তার ছবি প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু হামলার পর ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা এই হামলা চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়া প্লেনে না গিয়ে কেন সড়কপথে কক্সবাজার গেলেন তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বেগম জিয়ার সফরের বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাও চাওয়া হয়েছিল। ফলে খালেদা জিয়ার সফরে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর পড়ে।

এ ছাড়া খালেদা জিয়া কোথায়, কিভাবে যাবেন তা একান্তই তার নিজস্ব বিষয়। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমতাসীন দলের পরামর্শ অনুযায়ী সফরসূচি ঠিক করবেন না। আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করছেন, খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় দেখার নামে রাজনীতি করছেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো সরকারি সফরে যান তিনি সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন। রাজনৈতিক নেতাদের যেকোনো কর্মসূচি রাজনীতির অংশ। এমনকি তাদের ব্যক্তিগত জীবনও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণকার্যক্রম চালাতে গিয়ে রাজনীতি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। বরং আমরা দেখছি রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শনের সময় খালেদা জিয়া সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেননি। এমনকি এই ইস্যুতে সরকারের ব্যর্থতার দিক তুলে ধরেননি। তিনি দীর্ঘ যাত্রাপথে পথসভাও করেননি; কিন্তু এরপরও তার যাত্রাপথে জনস্রোত ক্ষমতাসীন দলকে যে বেশ দুর্ভাবনায় ফেলেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়াই বেগম জিয়ার সফরে যেভাবে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ মহাসড়কের দুই পাশে সমবেত হয়েছে, তাতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। কারণ আগামী দিনে যদি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে খালেদা জিয়ার জনসভাগুলো যে ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে; এই সফর থেকে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের সদিচ্ছাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। শুধু দেশের মানুষকে নয়, আন্তর্জাতিক মহলকেও বিএনপির পক্ষ থেকে এই ধারণা দেয়া সম্ভব হবে- দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপি আদৌ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবে কি না। একটি অরাজনৈতিক সফরে যদি এ ধরনের হামলা হয়, তাহলে নির্বাচনী প্রচারণার সময় নিরাপত্তা দেবে কে? কারণ এর আগেও ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা যে ক্ষমতাসীন দলের জন্য আত্মঘাতী হয়েছে, তা সম্ভবত দলের নেতাকর্মীরা বুঝতে পেরেছেন। এ কারণে পুরো ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার, মোবাইল ফোনে ভিডিও এবং ছবির কারণে হামলাকারীদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। যদি এসব হামলার ঘটনার সাথে বিএনপি বা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকে, তাহলে তো পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদের গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু যাদের ছবি গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে, তাদের কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি।

এই হামলার দায় এড়াতে মরিয়া প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির এক নেতার নামে টেলিফোন কথোপকথন ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিএনপির এই নেতা দাবি করেছেন, আসলে এই কথোপকথন তার নামে ফেনী আওয়ামী লীগের এক নেতার। যিনি তার কর্মীদের গাড়িবহরে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। আসলে ক্ষমতাসীন দল ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে গিয়ে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে ফেলেছে। ফলে অতীতে বিএনপির গাড়িবহরে হামলার ঘটনাগুলো সামনে চলে এসেছে। এর আগে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে যাওয়ার সময় মির্জা ফখরুল ইসলামের ওপর এভাবে হামলা চালানো হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ দেয়ার সময় বিএনপির পাঠানো ত্রাণবাহী ট্রাক আটকে দেয়া হয়েছিল। বেগম জিয়ার গাড়িবহরে হামলার পর নেতিবাচক রাজনীতির পুরনো কাহিনীগুলো আবারো সামনে চলে এসেছে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা হয়তো এখন উপলব্ধি করছেন, গাড়িবহরে হামলার ফলে খালেদা জিয়ার সফরটি যেমন সারা দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে; তেমনি সরকারের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই সফর থেকে বিএনপির কী অর্জন হলো? খালেদা জিয়া তিন মাসের বেশি সময় লন্ডনে চিকিৎসা শেষে ঢাকা ফিরে বিমানবন্দরে ব্যাপক জনসমাগম করতে সক্ষম হন। সর্বশেষ বিএনপির বড় ধরনের সমাবেশ হয়েছিল গত বছরের ১ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশে। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন আর কোনো বড় আকারের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বের হননি।

লন্ডন থেকে এসে খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ ও তাদের অবস্থা দেখার জন্য শরণার্থীশিবিরে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বেগম জিয়া যে বিদেশ সফর শেষ করে এ ধরনের সফরে যাবেন, তা সম্ভবত ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অনুমান করতে পারেননি। বিএনপি চেয়ারপারসন খুব সাফল্যের সাথে একটি বড় ধরনের গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করেছেন। এর মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মাঝে নির্বাচনকে ঘিরে মাঠে নামার ইঙ্গিত তিনি দিতে পেরেছেন। একই সাথে লন্ডন থেকে শারীরিকভাবে যথেষ্ট সুস্থ হয়ে এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এসেছেন, সেই বার্তাও তিনি নেতাকর্মীদের দিতে পেরেছেন। স্বাভাবিকভাবে বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন। আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন।

এই হামলার সবচেয়ে অশুভ দিকটি হচ্ছে, আগামী নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা। বিরোধী দলকে ঠেকানোর জন্য এ ধরনের রাজনৈতিক কৌশল যদি ক্ষমতাসীন দল গ্রহণ করে, তাহলে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো দূরে থাক, বিরোধী নেতাকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা থাকবে না, সে প্রশ্নও উঠবে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার যৌক্তিকতা আরেকবার প্রমাণ হলো। এখন ক্ষমতাসীন দলের উচিত হবে দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য এই হামলার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা। এতে সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটবে।

ক্ষমতাসীনদের উপলব্ধি করতে হবে পাঁচ বছর ধরে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ও বিরোধী রাজনীতিবিহীন অবস্থার পরও বিএনপির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। দলের নেতাকর্মীরাও রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েনি। এখন যদি সহাবস্থানের রাজনীতির প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়, তাহলে ক্ষমতাসীন দলও লাভবান হবে। কারণ প্রতিহিংসার রাজনীতি কারো জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। তা ছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবলে চলে না, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়। ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না, পরিবর্তন আসবেই। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য দরকার সহাবস্থানের নীতি। গত দশ বছরে নির্র্মূলের রাজনীতি যে ব্যর্থ হয়েছে, বেগম জিয়ার সফরে জনস্রোত তার প্রমাণ।

[email protected]