ছয় ‘ব্যাটলগ্রাউন্ডের’ ৫টিতেই পিছিয়ে বিজেপি

ছয় ‘ব্যাটলগ্রাউন্ডের’ ৫টিতেই পিছিয়ে বিজেপি

সকাল দেখে বাকি দিন কেমন যাবে বলা গেলেও ভোটের প্রাথমিক ফল দেখে মোটেই বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত শেষ হাসি কে হেসে যাবে। বিশেষ করে ভারতের মতো জনবহুল ও বৈচিত্রপূর্ণ দেশে। তবে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত ভারতের লোকসভা ভোটের প্রাথমিক ফল দেখে মনে হচ্ছে, দুদিন আগে বুথ ফেরত জরিপ সংস্থাগুলো বিজেপি ও এনডিএর জয় নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে, তা সম্ভবত ফলছে না।

বুথ ফেরত জরিপ সংস্থাগুলো সমীক্ষকেরা জানিয়েছিলেন, বিজেপি ও এনডিএ গতবারের চেয়েও ভাল ফল করে ৪০০ আসনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। কিন্তু বেলা এগারোটার চিত্র দেখাচ্ছে, শাসক দল তার খুব কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারছে না। বরং বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ আশাতীত ভালো করছে। সবচেয়ে বড় কথা, বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে কংগ্রেস জমি ছাড়েনি। ফলাফলের প্রাথমিক ফল ধরে রাখতে পারলে কংগ্রেস এক শ আসন পেরিয়ে যেতে পারে।

মজার বিষয় হচ্ছে, বুথ ফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর গতকাল সোমবার ভারতের শেয়ারবাজারে সূচক প্রায় ২ হাজার ৩০০ বেড়েছিল। আজ সকালে ফল ঘোষণা শুরুর পর এই বাজার প্রায় ৩ হাজার সূচক পড়ে গেছে।

এবারের ভোটের বিশেষত্ব হলো হাওয়াহীনতা। ২০১৪ ও ২০১৯ সালে আসমুদ্রহিমাচল নরেন্দ্র মোদির নামে ভেসে গিয়েছিল। জাতীয়তাবাদের নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদে ছেয়ে গিয়েছিল অধিকাংশ প্রদেশ। এবার তা অনুপস্থিত। এমনকি প্রাথমিক ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, হিন্দি–বলয়েও রাম মন্দির ঢেউ তুলতে পারেনি। ভোটের প্রচারে বিরোধীরা বড় করে তুলে ধরেছিলেন তীব্র বেকারত্ব, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সংবিধান–গণতন্ত্র রক্ষার বিষয়। প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রচার কাজে এসেছে।

এবারের ভোটে বিশ্লেষকদের নজরে ছিল প্রধানত ছয়টি বড় রাজ্য। কর্নাটক (২৮), মহারাষ্ট্র (৪৮), বিহার (৪০), উত্তর প্রদেশ (৮০), পশ্চিমবঙ্গ (৪২) ও অন্ধ্র প্রদেশ (২৫)। বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রাথমিক ফলে দেখা যাচ্ছে, একমাত্র অন্ধ্র প্রদেশ ছাড়া বিজেপি ও তার শরিকেরা ততটা ভালো ফল করতে পারেনি। অন্ধ্র প্রদেশের সম্ভাব্য ভাল ফলের প্রধান ভাগীদার অবশ্যই তেলুগু দেশম। তারা রাজ্য বিধানসভাও সম্ভবত দখল করতে চলেছে।

কিন্তু বাকি পাঁচ রাজ্য, যা এবার ‘ব্যাটেল গ্রাউন্ড’ স্টেট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, সেখানে বিজেপির হাল বেশ খারাপ। সবচেয়ে বড় বিস্ময় জাগিয়েছে উত্তর প্রদেশ। যে রাজ্য থেকে বিজেপি এবার ৭০–৭৫ আসন পাবে বলে আশা করছিল, সেখানে প্রাথমিক ফলে দেখা যাচ্ছে, ইন্ডিয়া জোট ৪৩ আসনে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ আসনে এগিয়ে সমাজবাদী পার্টি, সাতটি কংগ্রেস। বেলা ১১টার ফলে দেখা যাচ্ছে আমেথিতে পিছিয়ে রয়েছেন স্মৃতি ইরানি। এমনকি কিছুটা সময় বারানসিতে পিছিয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও।

কর্নাটকে বিজেপি ও তার সহযোগীরা গতবার পেয়েছিল ২৭ আসন। একটি মাত্র আসন পেয়েছিল বিরোধীরা। এবার সেখানে কংগ্রেস অন্তত ১০ আসনে এগিয়ে রয়েছে। মহারাষ্ট্রের ফল চমকে দিচ্ছে। বিজেপি ও তার সহযোগী শিন্ডে শিবসেনা ও অজিত পাওয়ারের এনসিপিকে সরিয়ে জায়গা দখল করেছে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা, শরদ পাওয়ারের এনসিপি ও কংগ্রেস। বেলা ১১টার পর্যন্ত তারা এগিয়ে রয়েছে মোট ৩০ আসনে। বিহারে এনডিএ ভালো করলেও ইন্ডিয়ার কাছে তারা পিছিয়ে রয়েছে অন্তত ৮টি আসনে। গতবার তারা একটিমাত্র আসন হারিয়েছিল কংগ্রেসের কাছে।

বিজেপি এবার প্রবল আশা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ ঘিরে। গতবার তারা ৪২ আসনের মধ্যে পেয়েছিল ১৮টি। এবার বেলা ১১টার হিসেবে তারা এগিয়ে মাত্র ১২টিতে। তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ৩০টিতে।

ব্যাটেল গ্রাউন্ড রাজ্যগুলো বাদ দিলে হিন্দি–বলয়ের অন্য রাজ্যেও বিজেপিকে প্রবল লড়াইয়ের মধ্যে রেখেছে কংগ্রেস। যেমন রাজস্থান। গতবার বিজেপি ২৫ আসনই জিতেছিল। এবার কংগ্রেস ১০ আসনে এগিয়ে। হরিয়ানার ১০ আসনই জিতেছিল বিজেপি। এবার কংগ্রেস সেখানে ছয়টিতে এগিয়ে। বিজেপি হিন্দি–বলয়ে ভালো করছে গুজরাট, মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে।

বিজেপির মান বাঁচাচ্ছে যে দুই রাজ্য, তার একটি ওডিশা, অন্যটি তেলেঙ্গানা। ওড়িশাতে ২১ আসনের মধ্যে বিজেপি বেলা ১১টায় ১৯ আসনে এগিয়ে। তারা বিধানসভায়ও এগিয়ে রয়েছে। তেলেঙ্গানার ১৭ আসনের মধ্যে বিজেপি গতবার পেয়েছিল ৪টি, এবার ৮টিতে তারা এগিয়ে। কংগ্রেসও এগিয়ে ৮ আসনে। এই রাজ্যে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পথে বিআরএস।

বেলা ১১টার গণনার ট্রেন্ড দেখে বলা যায়, ভোট লোকসভার হলেও এর চরিত্র ছিল পুরোপুরি আঞ্চলিক। প্রতিটি রাজ্যে ভোট হয়েছে সেই রাজ্যের ইস্যু অনুযায়ী। তাই, সর্বভারতীয় কোনো প্যাটার্ন এই ভোট এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই ভোটে পরাজয় ঘটেছে বুথফেরত জরিপ সংস্থাগুলোর। ২০০৪ সালের মতো এবারও তারা ব্যর্থ। কিংবা ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটের মতো এবারও তারা নিজেদের লজ্জায় ফেলতে চলেছে।

সরকার গড়তে প্রয়োজন ২৭২ আসন। সেই নিরিখে প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু এই চিত্র অপরিবর্তিত থাকলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষে তা খুব একটা সম্মানজনক হবে না। কারণ, এনডিএ ২৯৭ আসনে এগিয়ে থাকলেও বিজেপি ২৪০ এর কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। নরেন্দ্র মোদির ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু হয়তো চলবে না।