মিয়ানমার নিয়ে চীন-রাশিয়ার ভূমিকা লজ্জাজনক : জাতিসংঘ দূত

মিয়ানমার নিয়ে চীন-রাশিয়ার ভূমিকা লজ্জাজনক : জাতিসংঘ দূত

রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমার নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দুই দেশ চীন ও রাশিয়ার অবস্থানকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যায়িত করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত (র‌্যাপোর্টিয়ার) ইয়াংহি লি।

ছয় বছর ধরে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করা ইয়াংহি মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিসি) বিকল্পে একটি ‘এডহক ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের প্রস্তাব করবেন বলে জানিয়েছেন।

 

বাংলাদেশে পাঁচদিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি আইসিসির কাছে পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে।

‘আমরা নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে চাপ দেয়া অব্যাহত রাখব। পাশাপাশি মিয়ানমারের বিষয়টি দেখতে একটি আন্তর্জাতিক এডহক ট্রাইব্যুনাল গঠন করার কথা বলব।’

এই ট্রাইব্যুনালের ধরন কেমন হবে জানতে চাইলে ইয়াংহি লি বলেন, আগামী মার্চে মানিবাধিকার কমিশনে যে প্রতিবেদন দেবেন সেখানে একটি মডেল সুপারিশ করবেন। সেটা হতে পারে সিয়েরালিওন বা রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালের মতো।

 


২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমনাভিযানের মুখে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় সাত লাখের বেশি মানুষ। সেখানে সেনা সদস্যরা নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে বলে পালিয়ে আসাদের বিবরণে উঠে এসেছে।

লাখ লাখ রোহিঙ্গার স্রোতে বাংলাদেশে সৃষ্ট শরণার্থী সংকটের সমাধানে মিয়ানমার যাতে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করে সেজন্য নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল যুক্তরাজ্য। তবে চীন ও রাশিয়া ওই উদ্যোগ বর্জন করে।

এই সংকটের সমাধানে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশকে দেওয়া হলেও এখনও তা কোনো ফল বয়ে আনেনি।

মিয়ানমার নিয়ে চীন ও রাশিয়ার এই অবস্থান তুলে ধরে তাদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী, সে প্রশ্ন জাতিসংঘের দূত ইয়াংহি লিকে করেছিলেন এক সাংবাদিক।

জবাবে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা বিশেষ করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নির্যাতনের সব তথ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও চুপ থাকাটা লজ্জাজনক। নির্যাতনের অভিযোগ যে মিথ্য নয়, তা কক্সবাজার ঘুরে দেখে যান। আমি বিশেষ করে চীনকে বলব, যেহেতু তারা গ্লোবাল লিডার বা বিশ্বনেতা হওয়ার চেষ্টায় আছে, মানবাধিকারকে সম্মান না দেখিয়ে আপনি কখনও গ্লোবাল লিডার হতে পারবেন না।’

চীন ও রাশিয়াকে রাজি করাতে জাতিসংঘ কেন ব্যর্থ হচ্ছে এমন এক প্রশ্নের উত্তরে ইয়াংহি লি বলেন, ‘এই দুই রাষ্ট্রকে রাজি করাতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে এটা কোনো ব্যর্থতার বিষয় নয়, এটা নিরাপত্তা পরিষদের গঠনগত বিষয়, আর সেটা হয়েছিল গত শতকের শুরুতে। এখন চলছে একবিংশ শতাব্দী। এই শতাব্দী হবে সংস্কারের শতাব্দী।’

‘মারাত্মক মানবাধিকার লংঘনের বিষয়গুলো কীভাবে দেখা হবে, সেজন্য একটা দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করতে হবে।’

বাংলাদেশে পাঁচদিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে আসেন জাতিসংঘের র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভিবাংলাদেশে পাঁচদিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে আসেন জাতিসংঘের র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভিনিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্সের ভিটো ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করে এই কথা বলেন তিনি।

মিয়ানমার থেকে পোশাক আমদানি করা আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত।

‘আমি কাউকে কেনাকাটা বন্ধ করে দিতে বলছি না। এই দেশ থেকে অনেক ব্র্যান্ড তাদের পোশাক কেনেন। দায়িত্বশীল ব্যবসা করতে হলে মানবাধিকারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে,’ বলেন তিনি।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের পর সেখানে যেতে বাধা পাওয়ার কথা তুলে ধরে দুঃখপ্রকাশ করেন ইয়াংহি লি। পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ছয় বছর মিয়ানমার নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দক্ষিণ কোরিয়ান এই অধ্যাপক বলেন, ‘২০১৪ সালের জুলাইয়ে প্রথম মিয়ানমার যাই। এই সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন, ইয়াঙ্গুন, সিথউ, বুথিডং, মংগুদু, নাইপিদোসহ অনেক শহরে গিয়েছি। স্থানীয় প্রতিনিধি, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কীভাবে রাখাইন রাজ্যের মানবাধিকার পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যায় সে বিষয়ে তাদের সঙ্গে বার বার আলোচনা হয়েছে।’

‘২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাখাইনের উত্তরাঞ্চল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। আরসার আক্রমণের শিকার গ্রামগুলো দেখেছি। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পরে রাখাইনে চলা ‘নিরাপত্তা অভিযান’ শুরু হয় যাতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে মানবাধিকার লংঘন হয়।’

মিয়ানমারে সর্বশেষ সেনা অভিযানে রোহিঙ্গা নির্মূল শুরু হওয়ার পর সেখানে যেতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ার প্রসঙ্গে তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতেও একবার রাখাইনের যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে এসেছেন চারবার। এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারি এবং এখন আবার বাংলাদেশে এলেন। এর বাইরে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায়ও গিয়েছেন। রাখাইনের রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত হয়ে এসব দেশেও অবস্থান করছে।

‘সেখান থেকে চলে আসা প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা যারা কক্সবাজারে আছে তাদের সাথে দেখা করি। তাদের সঙ্গে আলাপ করে হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, নির্যাতন, মাথা দ্বিখণ্ডিত করা, শিশুদেরকে আগুনে নিক্ষেপের মতো নির্যাতনের কথা জানতে পারি।’

ইয়াংহি লি বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর হাতে গণধর্ষণের শিকার অনেক মানুষের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। নির্যাতনের অনেক ভয়ঙ্কর বর্ণনা তারা দিয়েছেন।’

‘কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশাপাশি আমি রোহিঙ্গা খ্রিস্টানদের সঙ্গে দেখা করেছি। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা সরকারের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। সে কারণে তারা রাখাইন ছেড়েছেন।’

এমজে/