মানবিক উপলব্ধিই সবচেয়ে বড় অর্জন: মেগান মারকেল

মানবিক উপলব্ধিই সবচেয়ে বড় অর্জন: মেগান মারকেল

সারা বিশ্বে মেগান নামেই আলোচনার তুঙ্গে আছেন। পুরো নাম মেগান মারকেল। জন্ম ১৯৮১ সালের ৪ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে জন্মেছেন। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের গৃহবধূ তিনি।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স হ্যারি প্রেমে পড়েন মার্কিন টিভি সিরিয়াল ‘স্যুইটস’ অভিনেত্রী মেগান মারকেলের। তারা প্রেমের শুভ পরিণতি দিতে বিয়ে করেন।

বর্তমানে ব্রিটিশ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাতি প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মারকেল রাজপরিবার ছাড়ছেন- এমন ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। রাজপরিবারে চলছে সংকট। প্রিন্স হ্যারির এমন সিদ্ধান্তকে সমালোচকরা অষ্টম এডওয়ার্ডের রাজসিংহাসন ত্যাগের সঙ্গে তুলনা করছেন। যা নিয়ে গণমাধ্যমে হইচই পড়ে গেছে।

শুধু ‘সিনিয়র রয়্যাল’ পদ থেকে সরে যাওয়া নয়, হ্যারি-মেগান সোভেরেইন গ্র্যান্ট নেবেন না এমন কথাও জানিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের জন্য রাজপরিবারের সদস্যদের সোভেরেইন গ্র্যান্ট দেয়া হয়।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে সোভেরেইন গ্র্যান্ট হিসেবে ৮ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড (৯১০ কোটি টাকা প্রায়) বরাদ্দ দেয়া হয়। হুট করে এত সম্পদ আর রাজপরিবারের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া খুব সহজ কাজ নয়।

কানাডাতে আছেন হ্যারি-মেগান দম্পতি। সেখানেই নতুন করে পথচলা শুরু করতে যাচ্ছেন। আগের মতো বড় পর্দায় হয়তো ফিরবেন না মারকেল। কানাডার টেলিনাটক স্যুইটসের প্রতিটি পর্বে অভিনয়ের জন্য ৫০ হাজার ডলার পারিশ্রমিক পাচ্ছেন মারকেল।

অভিনয় ছাড়াও ‘সাবেক প্রেসিডেন্ট’ মর্যাদায় কোনো বড় পদে চাকরি করতে পারেন তারা। সূত্র বলছে, এই ব্রিটিশ দম্পতি কোনো এক বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। এছাড়াও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সমাজকল্যাণে নানা কাজ করবেন। তবে একমাত্র ভবিষ্যৎই বলে দেবে কীভাবে তারা পরবর্তী জীবন অতিবাহিত করবেন।

মারকেল জন্মেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় রাজ্যের ইভানস্টন শহরে অবস্থিত নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিয়েটার এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।

বলতে গেলে পুরো ছেলেবেলাই কেটেছে হলিউডে। বয়স যখন সবে পাঁচ তখনই বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন হলিউড লিটল রেড স্কুল হাউসে। পরে লস অ্যাঞ্জেলেসের ইমেক্যুলেটহার্ট হাইস্কুলে পড়েন।

শিক্ষাজীবন থেকেই আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইয়ারসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন।

মূল পরিচিতি আসে অভিনয়ে। ২০১১ সাল থেকে মারকেল মার্কিন অপরাধমূলক নাট্য ধারাবাহিক স্যুইটসে র‌্যাচল জেইন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এছাড়াও তিনি কল্পবিজ্ঞান এবং গোয়েন্দা কাহিনীনির্ভর মার্কিন ধারাবাহিক ফ্রিংগিয়ের বিশেষ গোয়েন্দা অ্যামি জেসাপ ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শকপ্রিয় হন। টিভি প্রোগ্রামে ডোনেশনের টাকাও তুলেছেন।

২০০২ সালে জেনারেল হসপিটাল, ২০০৪ সালে সেঞ্চুরি সিটি, ২০০৫ সালে কাটস কোরি ‘মাই বয়ফ্রেন্ডস ব্যাক’, ২০০৫ সালে লাভ আইএনসি, ২০০৬ সালে ওয়ান ভার্সেস হানড্রেড, ২০০৬ সালে দ্য ওয়্যার অ্যাট হোম সুসান- এসব চলচ্চিত্রে কাজ করে ব্যাপক পরিচিতি পান।

২০১৮ সালের মে মাসে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের ষষ্ঠ উত্তরাধিকারী হ্যারির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক টিভি অভিনেত্রী মারকেলের বিয়ে হয়। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানে মারকেলের বাবা টমাস মারকেল অনুপস্থিত ছিলেন।

২০১৮ সালের আগস্ট মাসে বাবাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লেখেন মারকেল। নিয়মরীতির কঠিন জীবন কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছেন না মারকেল। ব্যক্তিজীবন নেই বললেই চলে এমন অবস্থার কথা বারবারই তার কথায় উঠে এসেছে।

মারকেল বলেন, মিডিয়ার কড়া নজরদারির মধ্যে নতুন মা হওয়াটা একটা ‘সংগ্রাম’ ছিল। গত ১৫ অক্টোবর কেনসিংটন প্যালেস মারকেলের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর প্রকাশ করে। তাদের সন্তান আর্চি নিয়েই মিডিয়াজুড়ে তোলপাড় হয়েছে।

আইটিভি ডকুমেন্টারিতে মেগান বলেন, সদ্যবিবাহিতা ও মা হওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যেও তার জীবন গণমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। অথচ আমাকে খুব কম মানুষই প্রশ্ন করেছে, আমি ঠিক আছি কি না। দৃশ্যের অন্তরালে এটাই কঠিন বাস্তবচিত্র।

মাতৃত্বের প্রশ্নে মেগান বলেন, মাতৃত্বকালীন যে কোনো নারী সত্যিকার অর্থে নাজুক থাকে। এটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। এরপর যখন সন্তান জন্ম নেবে পরিস্থিতিটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে একজন নারী হিসেবে এটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এক কথায় বিশাল কিছু।

গত সেপ্টেম্বরে প্রিন্স হ্যারি ও মেগান তাদের ছেলে আর্চিকে নিয়ে প্রথমবার বিদেশ সফরে যান। এজন্য তারা নির্বাচন করেন আফ্রিকাকে। টানা ১০ দিনের এ সফরে তারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ ও সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেন। বলা হয়, মূলত এ সফরের মধ্যে দিয়েই তারা রাজপরিবার ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন।

রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর মেগান কানাডার ভাঙ্কুভারের অলাভজনক দুটি দাতব্য সংস্থা পরিদর্শন করেন। সংস্থা দুটি নারীদের নিয়ে কাজ করে।

সংস্থা দুটির নাম ডাউনটাউন ইস্টসাইড ওমেন সেন্টার ও জাস্টিস ফর গার্লস। সন্ত্রাসের শিকার, গৃহহীন ও দরিদ্র নারীদের নিয়ে কাজ করে ডাউনটাউন ইস্টসাইড ওমেন সেন্টার। সংস্থাটি নারীদের গরম খাবার, পোশাক, প্রসাধনী ও কাউন্সেলিং সেবা দিয়ে থাকে। তাছাড়া নতুন একটি দাতব্য সংস্থা চালুর কথা জানান হ্যারি ও মেগান।

আত্মকেন্দ্রিক জীবনের চেয়ে সামাজিক জীবন অনেক বেশি প্রাপ্তির ও সুখের। শুধু অর্থসুখ নয়, নীরব কষ্টে থাকা সাধারণ মানুষের কল্যাণেও দারুণ সুখ লুকায়িত। তা যেন অপার সুখ। ভালো কাজই মানুষকে মানুষের মাঝে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখে।

মানবিক জীবনবোধ আর উপলব্ধিই সবচেয়ে বড় অর্জন। নিশ্চিত বিলাসী সুখ বিসর্জন দিয়ে এসব বিশ্বাস নিয়েই আগামীর পথে পা বাড়াচ্ছেন রাজবধূ মেগান মারকেল। সারা বিশ্বের কাছেই তিনি হয়ে উঠেছেন অনন্যা।

এমজে/