ভারত থেকে রোহিঙ্গারা কেন বাংলাদেশে আসছে

ভারত থেকে রোহিঙ্গারা কেন বাংলাদেশে আসছে

ভারত থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, সেখান থেকে তাদের ধরে জোরপূর্বক সহিংসতাপূর্ণ মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ভারত সরকার দুই দফায় ১২ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠায়।

এর পরই রোহিঙ্গারা আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যায়। কারণ, যে নির্যাতন-হামলা-ধর্ষণের মুখে জীবন বাঁচাতে তারা মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছে, এখন সেই বিপদ নিয়ে আবার সেখানে ফিরে যেতে চায় না। তাই তারা সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গত ৪৯ দিনে এক হাজার ৩০০ রোহিঙ্গা এসেছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য তাদের অর্থের বিনিময়ে সহায়তা করছে দালালরা।

বাংলাদেশে ফিরে আসার পর তাদের অনেকে ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থান করছে। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে শরণার্থী শিবিরেও উঠে গেছে।

বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ভারত থেকে চলে আসা রোহিঙ্গাদের উখিয়ার ট্রানজিট পয়েন্টের আশ্রয়শিবিরে জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। তারা চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়ার কুতুপালং রাবার বাগানের আশ্রয়শিবিরে আসা রোহিঙ্গাদের সবার কাছে ইউএনএইচসিআর ভারত শাখার কার্ড আছে। কার্ডে তাদের শরণার্থী নম্বরও রয়েছে।

গতকাল বুধবার কথা হয় ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থান করা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকার নুরুল্লাহপাড়ার আহমদ শাহের ছেলে কামাল শাহের (৩৯)। তিনি বলছিলেন, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার সেনা, বিজিপি ও রাখাইন উগ্রপন্থীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। পরে তিনি গাড়িতে করে চলে যান ভারত সীমান্তে। সেখানে দালালের মাধ্যমে তিনি জম্মু-কাশ্মীরের রোহিঙ্গাপল্লীতে আশ্রয় নেন।

কামাল শাহ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সেখানে বেশ ভালোভাবেই দিন কাটছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভারত সরকার দুই দফায় ১২ রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এ ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। তাই পরিবারসহ ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসি। পরিবারে আমার স্ত্রী রাশেদা বেগম (৩০) ও মেয়ের রাজিয়া কলিমা (১০) আছে।’

কামালের সঙ্গে ভারত থেকে ১২ সদস্যের আরো তিনটি পরিবার ট্রানজিট ক্যাম্পে এসেছে। তাদের একজন মোহাম্মদ ইউনুছ (৩৫)। তিনি ফকিরাবাজার এলাকার আবদুল হাকিমের ছেলে। তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন ২০১২ সালে। পরে তিনিও দালালদের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর চলে যান। সেখানেই তাঁর তিন ছেলেমেয়ের জন্ম হয়। এখন আবার সবাই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

ভারত থেকে আসার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘গত বছর ডিসেম্বরের ২১ তারিখ দালালের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তে আসি। পরে কাঁটাতার পার হয়ে কুমিল্লা দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকেন। সীমান্ত পার হতে ভারতীয় দালালদের জনপ্রতি ১৫ হাজার রুপি দিতে হয়েছে।’

ফকিরাবাজার এলাকার আরেক রোহিঙ্গা নাগরিক জমির হোসেন (২৮)। তিনি ট্রানজিট ক্যাম্পে আছেন। তিনি ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে উখিয়ার আমতলী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। পরে জম্মু-কাশ্মীর চলে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে আতঙ্কে গত সপ্তাহে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে খাল পার হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে ট্রানজিট ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

জমির হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, জম্মু-কাশ্মীরের রোহিঙ্গাপল্লীতে প্রায় এক হাজার ৭০০ পরিবারের ছয় হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু বসবাস করে। ধরে ধরে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিতে পারে এই আতঙ্কে চার শতাধিক পরিবার বাংলাদেশে চলে এসেছে। তার মধ্যে দুই শতাধিক পরিবার এই ট্রানজিট ক্যাম্পে তাদের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে। বাকিরা আত্মীয়স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে।

সম্প্রতি ভারত থেকে পালিয়ে আসা রাশেদা বেগম (৩০) নামের এক রোহিঙ্গা নারী জানান, তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে ভারতে ইউএনএইচসিআর ফুড কার্ড দিয়েছিল। কিন্তু এখানে আসার পর তিনি এখানকার ফুড কার্ড নিয়ে ফেলেছেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী রাখাইনদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টের পর রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। আগে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখের বেশি। -এনটিভি অনলাইন

একে/