ঝিনাইদহে নির্বাচনের পর বাড়িছাড়া শত শত পরিবার

গরু-ছাগল লুটে নিয়ে গেরস্তের বাড়ির সামনেই ভুড়িভোজ (ভিডিও)

গরু-ছাগল লুটে নিয়ে গেরস্তের বাড়ির সামনেই ভুড়িভোজ (ভিডিও)

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা নির্বাচনের আগে থেকেই সহিংসতা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পরেও থেমে নেই সহিংতা। আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের পাল্টাপাল্টি হামলায় অশান্ত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট অব্যাহত রেখেছে। ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে গরু-ছাগলও। লুটে নেয়া ছাগল জবাই করে গেরস্তের বাড়ির সামনেই ভুড়িভোজের আয়োজন করছে।

জানা যায়, এ উপজেলায় চেয়ারম্যান হিসাবে মনোনয়ন পান জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নায়েব আলী জোয়াদ্দার। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনা।

দলের নেতাকর্মীরাও দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দলের উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আরিফ মন্নু নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন শৈলকুপা পৌর কমিটির সভাপতি ও পৌর মেয়র কাজী আশরাফুল আজম। দলের ইউপি চেয়ারম্যানরাও দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। অংঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ ও মহিলা লীগের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রচারণা চালাতে থাকেন।

নির্বাচনে দলের স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) প্রার্থী শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনা বিজয়ী হন। এরপর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। চলতে থাকে বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর, মারপিট, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট।

ভোট শেষে ফলাফল ঘোষণার পরপরই রাত থেকেই দোহা নাগিরাট গ্রামে নৌকা সমর্থক তিনজনের বাড়িতে হামলা চালায় স্বতন্ত্র আনারস প্রতীকের সমর্থকের লোকজন। ব্যাপক ভাঙচুর করে। বগুড়া গ্রামে নৌকা সমর্থক আবু মিয়ার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। পরদিন পাঁচপাখিয়া গ্রামে ৫টি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। ২৫শে মার্চ গবিন্দপুর গ্রামে নৌকা সমর্থক কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে এক শিশুসহ পাঁচ জনকে হাতুরি পিটিয়ে আহত করা হয়। ওইদিনই উপজেলার ধর্মপাড়া গ্রামে নৌকা সমর্থকদের ১০টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়, লুটে নেয়া হয় মাঠের ফসল। ২৬শে মার্চ রুপদা গ্রামে নৌকা সমর্থক ৫ জনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। ২৭শে মার্চ ভুলুন্দিয়া গ্রামে নিয়ামত আলীকে পিটিয়ে আহত করে আনারস প্রতীকের সমর্থকরা। শুক্রবার রাতে তার বাড়ি থেকে একটি খাসি ছাগল লুট করে বাড়ির সামনেই জবাই করে ভুড়িভোজ করে। উপজেলার পুটিমারি গ্রামে কয়েকজনের বাড়িঘরে হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুর লুটপাট করা হয়। ধর্মপাড়া গ্রামের টেন্টু, লিটন, কোবাদ আলী জানান, ভোটের দিন রাত থেকেই তাদের ওপর চরম অত্যচার শুরু হয়। কেউ কেউ প্রাণভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। তাদের জমিতে পাকা পেয়াজ রসুন উঠাতে দিচ্ছে না ওইসব সন্ত্রাসীরা। জমির ফসল জমিতেই পঁচে নষ্ট হচ্ছে।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রুপদা গ্রামে কাজী তোয়াজ উদ্দীন অভিযোগ করেন, তারা আওয়ামী লীগ করে এবং নৌকায় ভোট দিয়েছে। এজন্য আনারস সমর্থরা বাড়িতে ঢুকে তাকে, তার ছেলে সাইদুর কাজীকে ও নাতনি শিলাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ করি, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, তবুও নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজনের হাতেই মার খেতে হচ্ছে। আবার ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ সব ঘটনার যদি কোন সমাধান না পাই, তাহলে আমরা আর আওয়ামী লীগ করবো না। দল করে যদি নিজের দলের লোকদের কারণে জীবনের নিরাপত্তা না থাকে তবে কেন সেই দল করব?

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) আবু তাহের বলেন, নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে শৈলকুপায় দুই প্রতিন্দ্বী প্রাথী সমর্থকদের মধ্যে যে মারামারি ভাঙচুর চলছে তা কোন সভ্য মানুষের কাম্য নয়। তিনি আরো বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী একত্রে বসে এ সমস্য মিটিয়ে ফেলা উচিৎ। প্রয়োজনে প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই সহিংসতায় সাধারণ মানুষের জানমালের চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

একইচিত্র ঝিনাইদহ সদর, হরিনাকুণ্ডু পজেলা ও কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের শত শত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, ছাত্রলীগ ও কিছু গ্রাম্য সামাজিক দলের বিএনপি নেতা ও সাধারণ কর্মীরা প্রাণভয়ে বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, সহিংসতা বন্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। যারা অশান্তির সঙ্গে জড়িত তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে হাটফাজিল বাজারে ও হাটগোপালপুর বাজারে সহিংসতা রোধে বিশেষ আইন শৃংখলা বিষয়ক সভা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ এ সভার আয়োজন করেন। যে সমস্ত নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তারা নির্দিষ্ট অভিযোগ না দেয়ার কারণে আমরা ওই সমস্ত সন্ত্রাসীদের ধরতে পারছি না। যারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, শান্তি বিঘ্নিত করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সন্ত্রাসী যত ক্ষমতা ধর হোক, আর যে দলেরই হোক না কেন তাদেরকে আটক করে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে।

এমজে/