এমপি ওমর ফারুকের বক্তব্যে নিন্দার ঝড় (ভিডিও)

‘লাঠি কেটে রাখতে হবে....হয় আট সালের ফর্মুলা নাহলে ১৮ সালের’

‘লাঠি কেটে রাখতে হবে....হয় আট সালের ফর্মুলা নাহলে ১৮ সালের’

রাজশাহীর মুণ্ডুমালা পৌরসভার নির্বাচন ৩০ জানুয়ারি। ওই দিন ভোটের মাঠে নেতাকর্মীদের ‘লাঠি কাটা’ ও ‘লাঠিখেলা’ দেখানোর নির্দেশসহ প্রতিপক্ষকে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর দেয়া হুমকিমূলক বক্তব্যের সমালোচনার ঝড় উঠেছে রাজশাহীতে।

মুণ্ডুমালা পৌরসভার দুবইল স্কুল মাঠে রোববার সন্ধ্যায় আয়োজিত দলীয় এক সমাবেশে এমপি ফারুক নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রতিপক্ষের প্রতি হুমকিমূলক এসব বক্তব্য দিয়েছেন।

এ বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। প্রায় ১০ মিনিটের ওই বক্তব্যে রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তার নিজের দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এমপি ফারুকের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন প্রকাশ্যে।

উল্লেখ্য, মুণ্ডুমালা পৌরসভায় দলীয় মেয়র প্রার্থী আমির হোসেন আমিনের সমর্থনে তিনি এমন বক্তব্য দেন। এখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুর রহমান ও বিএনপির ফিরোজ কবীরও ভোটে লড়ছেন।

মুণ্ডুমালা পৌরসভার নিকটবর্তী তানোরের দুবইল স্কুল মাঠে পাঁচন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্ধিত ওই সভায় প্রধান অতিথি সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, প্রতিটা কেন্দ্রে আমার নির্বাচনের সময় ২০০৮ সালে বলেছিলাম- একশ, দেড়শ, দুশ' করে লাঠি কেটে রাখবেন। বলেছিলাম না? হ্যাঁ বলেছিলাম। ২০০৮ সালের কথা এটা। ওই ফর্মুলা এবার মুণ্ডুমালা পৌর নির্বাচনে নিয়ে নিতে হবে। যদি ভোটের দিন ব্যবহার করতে হয়, যদি ভোটের দিন ব্যবহার করার দরকার পড়ে, তাহলে ব্যবহার করবেন। নাহলে ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর ওই লাঠিখেলা হবে মুণ্ডুমালায়।

বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, শালা তোমরা আওয়ামী লীগের খাও আর আওয়ামী লীগের গায়ে থু-থু ফেল? এদের এবার শিক্ষা দিতে হবে।

এমপির এমন বক্তব্যে মুণ্ডুমালা পৌরসভা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুর রহমান বলেন, এমপি সাহেব আমাকে ও আমার সমর্থকদের উদ্দেশ করেই এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। কী আর করা।

বিএনপিকে লক্ষ্য করে এমপি ফারুক আরও বলেন, বিএনপি লাফাচ্ছে নাকি? আচ্ছা আমি বলছি, আমি বলে দিচ্ছি- বিএনপির এ মাটিতে যিনি জন্ম দিয়েছিলেন, তাকে কিন্তু আপনারাই পরাজিত করেছেন ভোটে। পরাজিত হওয়ার পরে সেই ভদ্রলোক স্ট্রোক করে মরে গেছেন, পৃথিবীতেই নাই। তো এখন ওইখান থেকে কিছু পোকা কীটপতঙ্গের জন্ম হয়েছে হয়ত। সেই কীটপতঙ্গ নিয়ে কথা বলার আমার কোনো দরকার আছে? আমি মনে করি না। ফর্মুলা দুটাই দিয়েছি আমি। হয় আট সালের ফর্মুলা নাহলে ১৮ সালের ফর্মুলা। আমি রাজশাহীতেই আছি, অসুবিধা নাই। আমার গাড়ি নিয়ে এখানে আসতে বেশি সময় লাগবে না।

বক্তব্যের শেষাংশে আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ওমর ফারুক চৌধুরী আরও বলেন,     ...থাকবেন, দেখবেন, ভোট করবেন, বিজয়ী হবেন, লাঠি নেবেন, লাঠি খেলা করবেন, বাড়ি চলে যাবেন।

বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থনকারী তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুণ্ডুমালা পৌরসভার বর্তমান মেয়র গোলাম রাব্বানী ও তার সহযোগীদের উদ্দেশে এমপি ফারুক চৌধুরী আরও বলেন, খুব খেয়েছো। ভোটটা শেষ হলে আমি গলায় হাত দিয়ে সব বের করে আনব। তুমি এমপি হবে। এমপি হবার শখ হয়েছে বটে। আমি শুনলাম একটি পুঁটি মাছ নাকি কাতল মাছকে গিলে খেয়েছে। তবে এসে দেখলাম। না কাতল মাছই পুঁটি মাছকে গিলে খেয়ে ফেলেছে।

তিনি বলেন, আপনাদের যদি কারো ইচ্ছা থাকে। রেকর্ড করে ছেড়ে দেন। ফারুক চৌধুরী এভাবেই কথা বলে। কেউ যদি আপনাদের একটা করে পশম তুলে আমি ওর দশটা করে পশম তুলে দেবো। কেউ যদি চোখ গরম করে তাকায়, লিখে রাখবেন নাম। আমি ওর চোখ একটা করে দেবো। আপনারা বুকের জামা খুলে লড়বেন। আপনারা শেখ হাসিনার পক্ষে লড়ছেন। আপনারা কোনো শালা বেইমানের পক্ষে লড়ছেন না। এজন্য যদি কিছু হয় আমি দায়ী থাকব। শেখ হাসিনা দায়ী থাকবে। আওয়ামী লীগ দায়ী থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এখন শেষ কথা- মুণ্ডুমালাতে নৌকা প্রতীককে জেতাতে হবে। শালা দিনের বেলা আওয়ামী লীগ করো, আর রাতের বেলা বিএনপির বাট চুষে দুধ খাও। এদের শিক্ষা দিয়ে দিতে হবে। আর কোনো সমস্যা আছে?
 
একজন সংসদ সদস্যের প্রকাশ্যে এমন হুমকিমূলক বক্তব্যে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এমন বক্তব্য সাংসদের ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ অংশ ও ‘উস্কানিমূলক বক্তব্য’ উল্লেখ করে আসন্ন পৌর নির্বাচনে অবাধ-সুষ্ঠু ভোট নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ফারুক চৌধুরীর এমন বক্তব্য দলেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগেরই একাংশের নেতাকর্মীরা।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও রাসিকের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু বলেন, সরকারের একজন এমপি প্রকাশ্যে এভাবে হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়ে ভোট ডাকাতির আরেকটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন। এমপির উস্কানিমূলক এমন বক্তব্যই বলে দেয়, এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন,  দলীয় সংসদ সদস্যের এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর। তার এ বক্তব্য কোনো কর্মিসভায় বলা কোনোভাবেই উচিত নয়।

এ বিষয়ে জানতে ওমর ফারুক চৌধুরী এমপির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।-যুগান্তর