মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা

বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় জেলেদের পোয়াবারো

বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় জেলেদের পোয়াবারো

বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছের নিরাপদ প্রজনন এবং ইলিশ বড় হওয়া নিশ্চিত করতে প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ২০ মে। তবে বঙ্গোপসাগরের আরেক অংশীদার প্রতিবেশী দেশ ভারতে নিষেধাজ্ঞা চলে পৃথক সময়ে। এই সুযোগে ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে অবাধে মাছ শিকার করে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একই সাগর হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময় এক করার দাবিও অনেক দিনের। তবে সেটি এখনও করতে পারেনি বাংলাদেশ। এতে ভারতীয় জেলেদের পোয়াবারো।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জলসীমায় প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই ৬৫ দিন গভীর সাগরে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। আর ভারতের পূর্ব উপকূলে ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন এবং পশ্চিম উপকূলে নিষেধাজ্ঞা চলে ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই। এই হিসাবে বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ভারতের পূর্ব উপকূলের জেলেরা ৩৯ দিন এবং পশ্চিম উপকূলের জেলেরা ১১ দিন সাগরে মাছ আহরণের সুযোগ পায়।

বাংলাদেশের জেলেদের অভিযোগ, বাংলাদেশের পটুয়াখালী, বরগুনা ও সুন্দরবনের কাছাকাছি অঞ্চল পড়েছে ভারতের পশ্চিম উপকূলে এবং গভীর সমুদ্রের কাছে পূর্ব উপকূল। ওই সময়ে দেশটির জেলেরা আমাদের জলসীমায় ঢুকে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করে। ভারতীয় জেলেদের ট্রলিং নৌযানে থাকা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা আগেই নৌবাহিনী জাহাজের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা নিরাপদে মাছ ধরে সটকে পড়ে। দুই দেশে একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা পালন করলেই কেবল আমাদের মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় বাংলাদেশের কিছু ট্রলার গোপনে সাগরে মাছ ধরতে যায়। ওই ট্রলারের জেলেরা দেখেছে, হাজার হাজার ভারতীয় ট্রলার বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ আহরণ করছে। ভারতীয় ট্রলার আমাদের জলসীমার ১ হাজার কিলোমিটার ভেতরে সোনারচর পর্যন্তও আসে। ভারতীয় পতাকাবাহী ট্রলারের ছবিও তুলে আনা হয়েছে।

বরগুনা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, দেশের জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের মাছ আহরণের ছবি মৎস্য অধিদপ্তরকে একাধিকবার দিয়েছেন। বেশির ভাগ সময়ে তারা রাতে প্রবেশ করে। তখন নৌবাহিনীর টহল জাহাজ থাকে না। এ ছাড়া ভারতের ফিশিং ট্রলার উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের টহল জাহাজের অবস্থান বিষয়ে আগেই নিশ্চিত হতে পারে।

দুই দেশে একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা পালন করার বিষয়ে গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, প্রতিটি দেশ যার যার নিজস্ব গবেষণার ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় ঠিক করে। বাংলাদেশের গবেষণা অনুযায়ী, আমরা সঠিক সময়ে নিষেধাজ্ঞা পালন করছি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের উচিত এই সময় মেনে চলা। বিষয়টি মীমাংসা করতে কারিগরি পরমর্শকদের নিয়ে আন্তঃদেশীয় বৈঠক করতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে আরেক গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইয়ামিনের দাবি, বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই ভুল সময়ে নিষেধাজ্ঞা পালন করছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের শিক্ষকদের সম্মিলিত গবেষণায় দেখা গেছে, সাগরে বেশির ভাগ প্রজাতির মাছের প্রজনন মৌসুম এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে। দুই দেশের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞার সময় এর মধ্যেই হওয়া উচিত।

ড. আনিছুর এ বিষয়ে বলেন, সাগরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন মৌসুম একেক সময়ে। সব প্রজাতির প্রজনন নিরাপদ করতে হলে প্রায় সারাবছর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞার সময় মূলত ইলিশকেন্দ্রিক। কারণ, বঙ্গোপসাগরে মৎস্যসম্পদের ৮০ ভাগই ইলিশ। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আশ্বিনে অভ্যন্তরীণ নদীতে প্রজনন হওয়া ইলিশ এপ্রিলের দিকে ১২ থেকে ২৪ সেন্টিমিটার আকৃতির হয়ে সাগরে চলে যায়। তাদের বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা এবং বেশির ভাগ প্রজাতির প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ জলসম্পদ। সেই হিসাবে দুই দেশের নিষেধাজ্ঞা একই সময়ে হওয়া উচিত। এটা বাস্তবায়ন করতে হলে কারিগরি পরমর্শকদের নিয়ে আন্তঃদেশীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিষয়টি মৎস্য অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় গত বছর তৎপরতা শুরু করলেও এখনও বৈঠক হয়নি।

ভারতীয় ফিশিং ট্রলারের অনুপ্রবেশ বিষয়ে তিনি বলেন, সাগর টহল দিতে মৎস্য অধিদপ্তরের নিজস্ব জলযান নেই। নৌবাহিনীকে জানানোর পর তারা অভিযোগ মিথ্যা বলে জানিয়েছে।