স্বর্ণ চোরাকারবারিদের সুরক্ষা দেন প্রভাবশালী একাধিক এমপি

স্বর্ণ চোরাকারবারিদের সুরক্ষা দেন প্রভাবশালী একাধিক এমপি

ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম করিম মিন্টুকে গতকাল বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির এলাকার একটি বাসা থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গ্রেফতার করে। একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পরিকল্পনাকারীদের একজন আওয়ামী লীগ নেতা মিন্টু। স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আনার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এর নেপথ্যে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক পাচার, হুন্ডি ব্যবসায়ীরা যাদেরকে সুরক্ষা দিয়ে আসছিলেন একাধিক প্রভাবশালী এমপি। এসব এমপিরা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক পাচার, হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারীদেরকেই কেবল সুরক্ষা দিতেন না, এমপি মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গেও তারা জড়িত বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এর আগে গত রবিবার ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহম্মদ বাবুকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এমপি আনারকে কলকাতার সঞ্জীবা গার্ডেনের দোতলার একটি অ্যাপার্টমেন্টে হত্যার পর চেয়ারে নগ্ন হয়ে বসা ও মুখে টেপ দেওয়া অবস্থার একটি ছবি আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল ও মিন্টুর মোবাইলে পাঠায় খুনিরা। মোবাইলে ছবি পাঠানোর সূত্র ধরে ডিবি তাদেরকে গ্রেফতার করে।

এমপি আনার ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে তার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া মিন্টুর সঙ্গে বিরোধ বাধে। তার নির্বাচনি এলাকার অনেকেই মনে করেন এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পরিকল্পনাকারীদের একজন এই মিন্টু। আনার হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী পলাতক আক্তারুজ্জামান শাহীন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রভাবশালী এমপিদের ঘনিষ্ঠজন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রভাবশালী এক এমপির কন্যার বিয়েতে এমপি আনার একটি প্রাডো মডেলের গাড়িও উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। এতেও ওই প্রভাবশালী এমপি আনারের ওপর সন্তুষ্ট হননি। ২০১৪ সাল থেকে এমপি আনার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক পাচার ও হুন্ডি ব্যবসা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। এই সব ব্যবসায়ী মাফিয়াদের কাছ থেকে এমপি আনার প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার মতো পেতেন। এই টাকার ভাগ নিয়ে ওই সব অঞ্চলের সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী কতিপয় এমপির সঙ্গে বিরোধ বাধে।

এর মধ্যে একজন প্রভাবশালী এমপি আনারের মাধ্যমে প্রতি মাসে দুই কোটি টাকা করে পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর থেকে আনার এই টাকার ভাগ বর্তমান এবং সাবেক প্রভাবশালী এমপিদেরকে দিতেন না। এই বিষয়টিও তাকে হত্যার অন্যতম একটা কারণ। এই অঞ্চলে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক ও হুন্ডি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শতাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। কিন্তু সাক্ষী প্রমাণের অভাবে একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী দেবেন বলে ধরা হয় তাদেরও একই পরিণতি ঘটে। ফলে এসব মামলায় কেউ সাক্ষী দিতে যায় না। এ কারণে স্বজনহারারা ন্যায়বিচার থেকে থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এমপি আনারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়েও তার নির্বাচনি এলাকা ঝিনাইদহ-৪ আসনের বাসিন্দারা একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তার স্বজনরাও একই কথা বলছেন। এই হত্যার নেপথ্যে জড়িত খুনিদের রক্ষা করতেও সেইসব প্রভাবশালী এমপিরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, তার হত্যাকাণ্ডে যারাই জড়িত থাকবে তাদেরকেই আমরা গ্রেফতার করবো। ইতিমধ্যে অনেক নেতারাই গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। এর আগে সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও অনেকেই গ্রেফতার হতে পারেন।