আ বু সা ঈ দ আ ন সা রী

‘আমাকে যদি কখনও আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়, তবে ভাববো আরেকটি দেশ আছে আমার, সেটি বাংলাদেশ’

‘আমাকে যদি কখনও আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়, তবে ভাববো আরেকটি দেশ আছে আমার, সেটি বাংলাদেশ’

১৯৭৮ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব মানবতাবাদীদের অন্যতম গুরু, অবিসংবাদিত বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা, বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী আরেক মানবতাবাদী জনমানুষের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমন্ত্রণে পাঁচদিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন।

বাংলাদেশ সফরে মোহাম্মদ আলীকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিলো ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। এ দেশের মানুষের শর্তহীন ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন তিনি।

ঢাকায় অবস্থান করলেও, সফর করেছেন সুন্দরবন, সিলেটের চা বাগান, পাহাড়ি শহর রাঙ্গামাটি এবং দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী কক্সবাজার।

বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলীর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৭ই জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের লুইসভিলে। বাবা ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে’র নামানুসারে প্রথমে তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে জুনিয়র।

যুক্তরাষ্ট্রে তখন বর্ণ বৈষম্য চরমে। আজ যে রকম প্রকাশ্য দিবালোকে জর্জ ফ্লয়েডকে পুলিশ হত্যা করলো যদিও সব পুলিশ সমান না। যা হোক, মজার কথা হলো ১৯৫৪ সালের একদিন ক্লে জুনিয়রের সাইকেল চুরি হয়ে গেলে সে পুলিশ অফিসার মার্টিনকে জানায়, সে সাইকেল চোরকে পেটাতে চায়। অফিসার মার্টিন তখন ছিলেন সে শহরের বক্সিং কোচ। তিনি বলেন, এর জন্য জুনিয়রকে লড়াই করা জানতে হবে। পরদিন তিনি মার্টিন এর কাছ থেকে বক্সিং শেখা শুরু করেন।

সেই ১২ বছর বয়স থেকেই প্রশিক্ষণ শুরু হয় ক্যাসিয়াস ক্লে জুনিয়রের। কোচ মার্টিন তাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে প্রজাপতির মতো নেচে নেচে মৌমাছির মতো হুল ফোটাতে হয়।

কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকসে লাইট-হেভিওয়েট শ্রেণীতে স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে প্রথম খ্যাতির শিখরে উঠতে সক্ষম হন ক্লে জুনিয়র। এর মধ্য দিয়ে প্রথম জনপ্রিয়তা পান তিনি।

১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ ও ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তিনটি ভিন্ন প্রতিযোগিতায় আন্তর্জাতিক হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

সানি লিস্টনের সঙ্গে জয়ের কিছু সময় পর জুনিয়র ১৯৬৪ সালে ইসলামি সংগঠন নেশন অব ইসলাম এ যোগ দেন। তার নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স, কারণ তিনি মনে করতেন তার পদবী ‘ক্লে’ দাসত্বের পরিচায়ক। ১৯৭৫ সালে গ্রহণ করে নাম পাল্টে হয়ে যান মোহাম্মদ আলী। তাঁর প্রতিপক্ষ এরিন ট্যারেল যখন তাঁকে মোহাম্মদ আলী নামে সম্বোধন করতে অস্বীকৃতি জানান তখন তিনি ফোঁসে উঠেন এবং ট্যারেলকে বলেন, আংক্যাল টম...!

 

১৯৬৪ সালে মোহাম্মদ আলী সৈনিক জীবনে প্রবেশ করতে গিয়েও ব্যর্থ হন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিতে বলা হলে তিনি যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান। আলীর যুক্তি ছিল: কোরআন যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ ছাড়া তিনি যুদ্ধে যাবেন না। তিনি বলেন, ভিয়েতনামের কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। তাদের কেউ তাকে ‘কালো’ বলেও গালি দেয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘কেন তারা আমাকে ইউনিফর্ম লাগিয়ে আমার বাসা থেকে দশ হাজার মাইল দূরে গিয়ে ভিয়েতনামের বাদামী মানুষদের উপর বোমা ও গুলি ছুঁড়তে বলবে, যখন লুইসভিলে তথাকথিত নিগ্রো মানুষের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করা হবে এবং তাদের সাধারণ মানবাধিকার অস্বীকার করা হবে?’

১৯৮০ সালে মোহাম্মদ আলী নিজের শিষ্য ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নেয়ার লড়াইয়ে নামেন। কিন্তু ১১ রাউন্ড পর হেরে যান তিনি। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আলীর মস্তিষ্কে পারকিনসন’স ডিজিজ নামের মারাত্মক রোগ ধরা পড়ে। ১৯৮১ সালে অবসর নেন আলী। ততদিনে তিনি অংশ নেয়া ৬১টি লড়াইয়ের ৫৬টিই জিতেছেন।

কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গের মধ্যেকার বর্ণ বৈষম্যে দূর করতে তিনি সব সময় সোচচার ছিলেন। মার্টিন লুথার কিং, ম্যালকম এক্সের সাথে মিলে তিনি সমাজ থেকে বর্ণবাদ দূর করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এক সভাতে মার্টিন লুথার কিং যখন বলছিলেন, ‘আমাদের ধর্ম আলাদা হতে পারে কিন্তু আমাদের আন্দোলন এক’। এ সময় আলী তাঁকে ভাই বলে সম্বোধন করেন।

ম্যালকম এক্সর সাথে কিছু মনোমালিন্য হয় আলীর, ১৯৬৫ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে হত্যার পর আলী বলেছিলেন, "আমি আশা করি আমি ম্যালকমকে বলতে পেরেছি বলে আমি দুঃখিত, যে তিনি এতগুলি বিষয়ে সঠিক ছিলেন। তবে আমি সুযোগ পাওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ”

১৯৯৯ সালে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ উপাধি পাওয়া মোহাম্মদ আলীকে ‘স্পোর্টসম্যান অব দ্য সেঞ্চুরি’ এবং বিবিসি ‘স্পোর্টস পারসোনালিটি অব দ্য সেঞ্চুরি’ অথবা শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে। এই মানবতাবাদের সিংহপুরুষ ৩রা জুন ২০১৬ সালে চির গন্তব্যে চলে যান। আজ বেঁচে থাকলে হয়তো জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে সোচচার হতেন। বিশ্বময় তাঁর আন্দোলন ছড়িয়ে দিতেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে।

মোহাম্মদ আলীকে যখন হলিউডে সংবর্ধিত করা হয় তখন তাঁর নামে একটি তারকা আঁকা হয় মেঝেতে। তিনি এতে অস্বীকৃতি জানান যেহেতু মোহাম্মদ তাঁর নবীর নাম যে পবিত্র নাম তিনি বহন করছেন, তা মেঝেতে লেখা অমর্যাদাকর কর বলে তিনি মনে করেন। হলিউড কর্তৃপক্ষ তাঁর কথামতো তা সরিয়ে দেয়ালে রেখে দেয়। বাকী আমেরিকার সব প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের নামের তারকা মেঝেতেই লেখা হয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর মোহাম্মদ আলীর মধ্যেকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো। নতুন দেশকে নতুন উদ্যমে তখন শাসন করছিলেন জিয়া। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সমুন্নত করতে। তাই আলীকে নিয়ে এসেছিলেন এ দেশে। একটা দারুণ ব্রানডিং হলো বাংলাদেশের। এ দেশের মানুষ যে কতো আপন তা আলী নিজ চোখে দেখলেন। মানবতাবাদী আলীকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া।

রাষ্ট্রপতি ভবনে আলী পাসপোর্ট পেয়ে আত্নহারা হয়ে উঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের হিরো আলীর কাছে বাংলাদেশ হয়ে যায় আশ্রয়ের স্থান, তিনি বলেন, ‘আমাকে যদি কখনও আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়, তবে ভাববো আরেকটি দেশ আছে আমার, সেটি বাংলাদেশ।’

[email protected]