চট্টগ্রামের জনসমুদ্রে বিএনপি নেতৃবৃন্দ

গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে

গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে

দেশে বারবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ বারবার গণতন্ত্র ধ্বংস করে স্বৈরাচারিভাবে দেশ চালাচ্ছে। তারা গণতন্ত্র ধ্বংসের জন্য খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছে। তাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।

শনিবার চট্টগ্রাম নগরের নুর আহমদ সড়কে আয়োজিত জনসভায় দলীয়-কর্মীসমর্থকসহ জনগণের প্রতি এই আহবান জানান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এই সমাবেশের ডাক দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। সমাবেশকে ঘিরে পুলিশি বাঁধা উপেক্ষা করে হাজার-হাজার নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ মিছিল যোগে সমাবেশস্থলে যান। পুরো নগরী ছিল মিছিলে প্রকম্পিত। সবার হাতে ছিলো খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন নির্বাচনে জনগণের আস্থা নেই। এই অবস্থায় জনগণকে নিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হবে।

জনসভায় মির্জা ফখরুল বলেন, বেগম জিয়া নির্জন, একাকিত্বের মধ্যে রয়েছেন। যেটা কখনোই স্বাধীন দেশের নাগরিকের প্রাপ্য নয়। আইনজীবীরা বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তার কোনো মেরিট (গুরুত্ব) নেই। তাঁকে হয়রানি ও আটকে রাখতে সাজানো ৩৬টি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি ঠিকভাবে হাঁটতে পারেন না, খেতে পারেন না। এই সরকার তাঁর চিকিৎসার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে সুচিকিৎসার দাবি করছি। কিন্তু এই কথা সরকার শুনছে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে বেগম জিয়া দেশের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন চারণ কবির মতো। গান গেয়েছেন গণতন্ত্রের। দীর্ঘ ৪০ বছর তিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারকে পরাজিত করে জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। এক-এগারোর বেআইনি সরকার তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। পরে অনমনীয় মনোবলের কারণে তিনি আবার গণতন্ত্রে ফিরে এসেছিলেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আসলে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, যারা জনগণের ভোট ডাকাতি করে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করে আছে, তাঁদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহি নেই। দেশে বন্যা হচ্ছে। কিন্তু বন্যা দুর্গতদের পাশে তাঁদের কাউকেই জনগণের পাশে দেখা যাচ্ছে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, মানুষ চাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু আদালতে ঢুকে খুন করা হচ্ছে। দিনদুপুরে মানুষ খুন হচ্ছে। আজকে কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই। সবখানেই মানুষকে নিপীড়ন করা হচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। মামলার বোঝা নিয়ে তাঁরা নিজ এলাকায় থাকতে পারেন না। কেউ চট্টগ্রামে, কেউ ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। অনেকেই হকারের কাজ করছেন। আর এটাই বাস্তব। এই অবস্থার তৈরি করেছে, কারণ তারা গণতন্ত্রকে ভয় পায়। জনগণকেও ভয় পায়। ডাকাতির মাধ্যমে নির্বাচন করে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়।

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। তাই এই নির্বাচন কমিশনকে বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচন বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। মানুষের এখন নির্বাচনের ওপর আস্থাই নেই। কারণ, ভোট দিয়ে কী হবে? সব তো সিল মেরেই আগে নিয়ে যায়। এখন নেতা-কর্মীদের জনগণের কাছে যেতে হবে। ছড়িয়ে পড়তে হবে। জনগণের অধিকারগুলোকে ফিরিয়ে আনার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, দেশ ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। ভেতরে সব ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে লুট করে শেষ করে দিয়েছে। শেয়ার মার্কেটকে শেষ করেছে। এগুলো রুখতে গণ-আন্দোলন করতে হবে। এই সরকার বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করেছে। মিডিয়াতে হস্তক্ষেপ করেছে। এখন খবর তাদের ইচ্ছামতো প্রকাশ হচ্ছে।

সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, খালেদার মুক্তি ও হাসিনার পতন একই সূত্রে গাঁথা। সরকার জামিন না দিয়ে খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। খালেদা জিয়াকে দুই কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় সাজা দেওয়া হয়। অথচ সেই টাকা ব্যাংকেই আছে। এখন তা সুদে আসলে ছয় কোটি টাকা হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মওদুদ আহমদ আহমদ বলেন, বিএনপিকে ধ্বংস করা সরকারের এজেন্ডা। কিন্তু শত বছরেও তা তারা পারবে না। তিনি বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিককে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থতার জন্য সরকার দায়ী। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত না পাঠিয়ে নোয়াখালীর চরে স্থায়ী আবাস নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমরা সরকারের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে পারলেই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। কারণ শেখ হাসিনা এখন বিচারপতি, তিনিই পুলিশের আইজি, দুদকের চেয়ারম্যান। কাজেই যারাই খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বাধা হবে, তাদের ক্ষমতা থেকে নামাতে হবে।

গয়েশ্বর বলেন, মশা মারতে পারে না, কিন্তু মানুষ মারতে পারে, এমন সরকারের কাছে খালেদার মুক্তি চেয়ে কী হবে? এটা অবৈধ সংসদ, ভেজাল সংসদ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করা হবে।

তাই তার কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে লাভ নেই। খালেদাকে আইনি লড়াইয়ে মুক্তি দেয়া হবে না, এটা প্রমাণিত। তিনি বলেন, আমরা আর খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইব না। যারা তাঁর মুক্তির পথে বাধা দেবে, তাদের ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো হবে।

সভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আমরা বিচার পাব না জেনেই বিচার কার্যে গিয়েছি। নির্বাচনে ভোট চুরি হবে জেনেও নির্বাচনে গিয়েছি। কারণ বিশ্ব যাতে জানতে পারে আমাদের অধিকার চুরি হয়ে গেছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, সরকার রাতের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণকে ভয় পায় বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতায় কারওর জন্য চিরস্থায়ী নয়।

বিএনপি নেতা মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আদালত সরকারের নিয়ন্ত্রণে। তবে আগামী ৭ দিনের মধ্যে খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পেয়ে এক মাসের মধ্যে জনতার মাঝে ফিরে আসবেন বলে ঘোষণা দেন মাহবুব উদ্দিন খোকন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, বিএনপিকে নিঃশেষ করা যাবে না।

বিএনপি গণমানুষের দল। বিএনপি ধরনা দেয়ার দল না। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার মুক্তির আন্দোলন চট্টগ্রাম থেকেই হবে। তাঁর মুক্তিতে সামনে কঠোর কর্মসূচি আসবে। তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। মীর নাছির বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় আর সম্ভব নয়। তাই তাকে কারামুক্ত করতে এখন কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর সেই আন্দোলনের সূত্রপাত হবে চট্টগ্রাম থেকে।

সভাপতির বক্তৃতায় ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বেগম খালেদা মুক্তির আন্দোলন চট্টগ্রাম থেকে শুরু হলো। আমরা নেত্রীকে মুক্ত করে আনবই।

সমাবেশে বক্তৃতা করেন, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মোহাম্মদ শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার, মহাসমাবেশের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, মহানগর বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক আবুল হাসেম বক্কর, সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ান সহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

জিএস/