‘নির্বাচনের বাইরে রাখতে খালেদা জিয়ার সাজা-মামলা’

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়: যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়: যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট

স্টেট ডিপার্টমেন্ট করসপন্ডেন্ট

৩০ ডিসেম্বরের ভোট কারচুপি আর একতরফা সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। নির্বাচনটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ ছিলােনা। নানান অনিয়ম, আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা, বিরোধী দলের এজেন্ট এবং ভোটারদের ভয়-ভীতির মতো ঘটনা ঘটেছে তাতে। হামলা- মামলার শিকার হয়েছেন বিরোধীদলের প্রার্থী ও সমর্থকরা।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত ২০১৮ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এমন মন্তব্য করা হয়েছে।

মানবাধিকার রিপোর্টে নির্বাচন ছাড়াও উঠে এসেছে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারাবন্দি করে রাখা, গুম-খুন ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড, বেআইনী গ্রেফতার, বিরোধী দলের উপর নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা প্রদানসহ বিভিন্ন ইস্যু।

বার্ষিক রিপোর্টে সারসংক্ষেপের শুরুতেই বাংলাদেশর সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের কারচুপির বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনা করে বলা হয়, “বাংলাদেশে সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় পদ্ধতির হলেও ক্ষমতার সিংহভাগও প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ডিসেম্বরের প্রশ্নবিদ্ধ এবং একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ ছিলােনা। নানান অনিয়ম, আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা, বিরোধী দলের এজেন্ট এবং ভোটারদের ভয়-ভীতির মতো ঘটনা ঘটেছে তাতে।”

এতে বলা হয়, “প্রচারণার শুরু থেকে নির্বাচন পর্যন্ত নানান রকম হয়রানি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, বেআইনী গ্রেফতার এবং সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে।আর এ পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে সভা-সমাবেশ এবং প্রচারণা চালাতে পারেননি বিরোধী দলের প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসতে বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে পরিচয়পত্র ও ভিসা পাননি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২২টি এনজিও’র মধ্যে মোটে ৭টিকে অনুমোদন দেওয়া হয়।”

রিপোর্টে বলা হয়, “আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কার্যত পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে সরকার।”

এতে বলা হয়, “আইনশৃঙ্খলাবাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর তথ্য রয়েছে কিন্তু সরকার খুব কমই এসব ঘটনার বিষয়ে তদন্ত বা ন্যায়বিচার করে থাকে। তাদের দ্বারা হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটলেও এমনটিই দেখা যায়।”

জাতিসংঘে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “২১০৭ সালে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তিনটি যৌন হয়রানি এবং অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ। অভিযোগের এ বিষয়টিতে তদন্ত চলমান আছে।”

মিথ্যা অভিযোগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সরকার আটক করছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অপরাধে বাংলাদেশে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার এবং বিচারের মতো ঘটনা ঘটছে। জাতীয় নিরাপত্তার ধোঁয়া তোলে তাদরকে মিথ্যা অভিযোগে আটক এবং বিচারের মুখোমুখি করা হয়।বছর জুড়ে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির হাজার-হাজার নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।”

বিএনপি চেয়ারপারসন এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলা এবং সাজাকে রাজনৈতিক চক্রান্ত উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “২০০৮ সালের কেয়ারটেকার সরকারের আমলে করা এক মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির কারণ দেখিয়ে ৫ বছরের সাজা দিয়েছে আদালত। তাঁর এই সাজায় তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতাকে দূরে রাখতে এটাকে রাজনৈতিক নীল-নকশা বলে মনে করেন তারা।”

এতে বলা হয়, “তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) জামিন দেয়ার ক্ষেত্রেও গড়িমসি করছে আদালত। এসমস্ত মামলায় যেকেউই দ্রুত জামিন পেয়ে থাকেন কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তা একমাসের মতো সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। মার্চের ১২ তারিখ যখনি হাইকোর্ট এ মামলায় জামিন দিলো তার পরপরই সুপ্রিম কোর্ট ২ মাসের জন্য স্থগিত করে দিলো। অভিযুক্ত হবার ঘটনায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রেখেছে।”

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে খালেদা জিয়ার রায় দেয়ার সময়টাতে আট দিনের ব্যবধানে বিএনপির ১,৭৮৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়।বিএনপির একজন মুখপাত্র হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, তাদের ও জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র তোলে ধরে রিপোর্ট বলা হয়, “সংবিধানে জীবনের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করা আছে। কিন্তু সরকার এবং তার এজেন্ট মানুষ বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে তার অসংখ্য নজির রয়েছে।”

এতে বলা হয়, “বছর জুড়েই সন্ত্রাস দমনের নামে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তাদের এই অভিযান, আটক সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এসব মৃত্যুকে দুই পক্ষের মধ্যে ক্রসফায়ারের ঘটনা বলে চালিয়ে দিয়েছে। সরকারও র‍্যাব, পুলিশ কিংবা অন্য বাহিনীর সঙ্গে সংগঠিত এসব ঘটনাকে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার কিংবা পাল্টা হামলা বলে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে।”

রিপোর্টে বলা হয়,“মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ৪০০ এর বেশি লোক বন্ধুক যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। অধিকারের তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে অক্টোবের বন্দুক যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ৪১৫ জন।”

সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানের সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের সময়টাতে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ছিলো গত বছরের তুলানয়ও বেশী।স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী মাদক বিরোধী অভিযানে ২৩০ জন নিহত হয় আর মে-জুন মাসে আটক করা হয় ১৭,০০০ জনকে। সরকারের এই কথিত মাদক বিরোধী অভিযানের সমালোচনায় সোচ্চার হয় মানবাধিকার সংগঠগুলো এবং সুশীল সমাজ। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন-অভিযানে বিচারবির্হভূত হত্যাকান্ড এবং গ্রেফতার হচ্ছে এবং নিরীহ মানুষ তার শিকার হচ্ছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কৌশল বলেও এর সমালোচনা করেন।”

অধিকারের তথ্যমতে গত বছরের প্রথম ১০ মাসে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাস্টডিতে মারা গেছেন ৫৭ জন বন্দি।

গুমের ভয়াবহ চিত্র তোলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, “মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং গণমাধ্যমের তথ্যমতে গুম এবং অপহরণ এখনো অব্যাহত আছে। আর এর অধিকাংশই ঘটছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা। এসব বিষয়ে সরকারকে খুব কমই প্রতিরোধ কিংবা তদন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়।”

রিপোর্টে আরো বলা হয়, “বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে বিচারের মুখোমুখি হওয়া বিরোধীদলের ৩ নেতার সন্তানদের ২০১৬ সালে আটক করে সরকার। তাদের বিরুদ্ধে ছিলোনা কোনো অানুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং আটকও হয়েছে তাও বলা হয়নি। আটকের সাত মাস পর হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে মুক্তি দিলেও এখনো সন্ধান নেই মির আহমদ বিন কাশেম এবং আমান আজমীর। জোরপূর্বক গুম নিয়ে কাজ করা সংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং কমিটি এ বিষয়ে সরকারকে অনুরোধ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।”

খ্যাতনামা আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার এবং নির্যাতনের কথা তোলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, “নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় উসকানি মূলক বক্তব্য রাখার অভিযোগে ৫ আগস্ট আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার করা হয়। ৬ আগস্ট যখন তাকে আদালতে হাজির করা হয় তখন তিনি একা হাঁটতে অক্ষম ছিলেন এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। আদালতে চীফ মেট্রোপলিট্রন ম‌্যাজিস্ট্রেটের কাছে সাক্ষ্য দেবার সময় শহীদুল বলেন- গ্রেফতারের রাতে তার চোখ বাঁধা হয়, মাথার উপর রাখা হয় ভারী ওজনের জিনিস এবং মুখে আঘাত করা হয়।”

রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে আরও কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে গুম, খুন, নির্যাতন, অযাচিত সেন্সরশিপ, সাইট ব্লক করা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন প্রভৃতি বিষয়।

বাংলাদেশে বাক স্বাধীনতায় বাধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে এ রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়, “সাংবাদিকরা হয়রানির ভয়ে সেলফ-সেন্সরশিপের দিকে ঝুঁকছে। আইনে বলা আছে ঘৃনামূলক বক্তব্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে কিন্তু এ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। যেসব গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করে থাকে তারা নানাভাবে সরকারের নেতিবাচক চাপের মুখে পরে। এছাড়া সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে। রিপোর্টার উইদাউট বর্ডারের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া আন্দোলনের সময় ২৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছিলেন।”

কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষায় রয়েছে নানা ব্যর্থতা। এরমধ্যে রয়েছে, হত্যা, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন, সরকারকর্তৃক অযথা গ্রেপ্তার, আইনবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ, বাক স্বাধীনতা হরণ, সমকামীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা।

মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের দেয়া তথ্যমতে গুম ও অপহরণের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এর বেশিরভাগের সঙ্গেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জড়িত। বাংলাদেশের সংবিধান সকল প্রকার নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ বা শাস্তিকে বে-আইনি ঘোষণা করেছে। তারপরেও গোয়েন্দা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সাধারণত সন্ত্রাসী ও বিরোধী দলের কর্মীদের থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য নির্যাতন করে থাকে। অধিকার জানিয়েছে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসে অন্তত ৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে মারা গেছে।

কারাগারের দুর্দশার কথা তুলে ধরা হয়েছে রিপোর্টে। বলা হয়েছে “কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার থেকে অতিরিক্ত আসামী রাখা হয়েছে, এগুলোতে সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা নেই ও শৌচাগার সুবিধারও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ ধরনের পরিবেশে প্রায়ই মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে কয়েদিরা। এই পরিবেশের কারণে গত বছর মোট ৭৪ কয়েদি মারা গেছে।”

“১৯৭৪ সালের স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ চাইলেই কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। প্রায়ই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের গ্রেপ্তারের পেছনে এ আইন দেখিয়ে থাকে। সংবিধান অনুযায়ী আটক কেউ তাকে গ্রেপ্তারের কারণের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু সরকার সাধারণত এ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করে না। সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো সরকারকে শুধুমাত্র সন্ত্রাসী নয় এমনকি সুশীল সমাজ ও বিরোধী নেতাদের জোরপূর্বক গুমের দায়ে অভিযুক্ত করেছে।”

রিপোর্টের সেকশন সিক্স এ বঞ্চনা, সামাজিক অপব্যবহার এবং মানবপাচারের বিষয়টি ওঠে এসেছে।

এতে বলা হয়, “এসব ক্ষেত্রে নারীরাই সবচেয়ে বেশী ভিকটিম হচ্ছেন।”

২০১৭ সালের আগস্টে শেরপুর জেলার একটি ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “ধর্ষণ মামলায় আটক হওয়ার ৪ ঘন্টার মাথায় পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে গেছেন অভিযুক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মুহাম্মদ আল-হেলাল। তিনি ওই অভিযুক্ত থেকে মুক্তি পেতে ভিকটিমের পরিবারকে ১৮ হাজার টাকা যা ২১১ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ দিতে চেয়েছিলেন। ভিকটিম থানায় তার বিরুদ্ধে মামলাটি পর্যন্ত দায়ের করতে পারেনি পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসির অসযোগিতার কারণে। তিনি মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে অবশ্য আদালতে অভিযোগ দায়ের হয় এবং হেলালের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।”

বাংলাদেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিম তার ঘটনাটিই প্রকাশ করেন না পরবর্তী হয়রানী এবং ঝামেলার ভয়ে।তাছাড়া সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং আইনী প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকারের বাধা-বিপত্তি তো আছেই। তবে আশার দিক হচ্ছে, ২০১৫ সালের একটি মামলার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ধর্ষণ মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে পুলিশ এবং অন্যদের ১৬ দফা নির্দেশনা জারি করেছে।”

বাংলাদেশের যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা মার্কিন রিপোর্টে স্থান পেয়েছে।

সামাজিক ওই ব্যাধিকে ‘হার্মফুল ট্রাডিশনাল প্র্যাকটিস’ হিসাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে,“ গত বছরে ৩৫জন নারীকে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। তাছাড়া গুরুতর আহত হওয়ার ৪১টি কেস রেকর্ড হয়েছে।”

যৌন নির্যাতনের বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়, “বাংলাদেশে এ বিষয়ে কঠোর আইন ও আদালদের কড়া নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রায়োগিক দুর্বলতার কারণে ঘটনাগুলো ঘটেই চলেছে। কিছু ঘটনা এমনও আছে যে, এটির কারণে কিশোরীরা স্কুলে এবং কাজে যাওয়া ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়। নারীদের পদে পদে বঞ্চনার অনেক ঘটনাও রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। শিশুদের জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষা, তাদের নির্যাতন এবং অনুপযুক্ত কাজে ব্যবহারের (অপব্যবহার) বিভিন্ন ঘটনার বর্ননা যা গত বছরের রেকর্ডভুক্ত হয়েছ তা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন এবং আদালতের নির্দেশনা এবং সরকারের তৎপতার বিষয়গুলো সেখানে স্থান পেয়েছে।”

বাক স্বাধীনতায় বাধা দেয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে রিপোর্টে। এতে বলা হয়, “সাংবাদিকরা হয়রানির ভয়ে সেল-সেন্সরশীপের দিকে ঝুঁকছে। আইনে বলা আছে ঘৃণামূলক বক্তব্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে কিন্তু এ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। যেসব গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করে থাকে তারা নানা ভাবে সরকারের নেতিবাচক চাপের মুখে পরে। এছাড়া সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে। রিপোর্টার উইদাউট বর্ডারের বরাত দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া আন্দোলনের সময় ২৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছিলেন।”

দুর্নীতিকে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “বাংলাদেশ সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এর ফলে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা এখনো দুর্নীতি। ২০১৮ সালে টিআইবির জরিপ থেকে জানা যায়, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোই বাংলাদেশের সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্থ সংস্থা।”

জিএস/