রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপন কারাগারে আটক ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপন কারাগারে আটক ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ

এক বছর তিন মাস নিখোঁজ থাকার পর সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপন কারাগারে আটক ছিলেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছিলো তারা কিছুই জানেনা এ বিষয়ে কিন্তু প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র তাকে গোপনে আটকে রাখার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

বাংলাদেশে পলিটিকো'তে প্রকাশিত এক কলামে এ কথা বলা হয়। কলামটি লিখেছেন বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।

জাস্ট নিউজ পাঠকদের জন্য কলামটি তোলে ধরা হলো:

দিনটি ছিলো ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর। ধানমন্ডির নিজের বাসা থেকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য গাড়ি নিয়ে একাই বিমানবন্দর যাওয়ার উদ্দেশে বের হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।কিন্তু তাকে পথিমধ্যে । উঠিয়ে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকেরা।

মারুফ রাষ্ট্রদূত হিসেবে ২০০৮ সাল থেকে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি কাতারে রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাজ্যে কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি অবসর নেন।

গুম হবার দিনই রাত ৭.৪৫ মিনিটে অপরিচিত একটি নাম্বার থেকে বাসায় ল্যান্ড ফোনে কথা বলেন মারুফ। বাসার কাজের লোককে তিনি জানিয়ে দেন অপরিচিত কিছু লোক তার কম্পিউটার নিতে আসবে, তাদের যেন সহযোগিতা করা হয়। ফোন দেবার ২০ মিনিট পরই পরিপাটি পোশাক পরিহিত ৩ জন মানুষ এসে পৌঁছায় সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের বাসায় এবং তারা সেখান থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোন সেট সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

যারা বাসায় এসেছিলো তাদের মাথায় ছিলো টুপি আর মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক। উদ্দেশ্য ছিলো বাসার সিসি টিভির থেকে যেন নিজেদের আড়াল রাখা যায়। মারুফের গুম হবার ঘটনা নিয়ে এটাই ছিলো তার পরিবারের দেয়া ভাষ্য।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকতা অবৈধভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক মারুফ জামানকে আটকে রাখার বিষয়টি নিশ্চত করেছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এই সূত্রের বক্তব্য- মারুফ জামান নির্দোষ নন, সরকার বিরোধী একটি ওয়েবসাইটের সঙ্গে তার যোগসূত্র ছিলো। বিচারবর্হিভূত আইন, গুম বা অপহরণ যে ঘটনাই ঘটুক বাংলাদেশে এখন এভাবেই সবকিছু সরকার বিরোধী বলে বৈধতা দেয়া হয়।

১৫ মাস ধরে গােপন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিলো মারুফকে, এসময়ে একবারের জন্যও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়নি তাকে। খুব সম্ভবত সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাকে আটক রেখেছিলো। শুক্রবার তাকে মুক্তি দিলো আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা।

বিষয়টি উল্লেখ করে মারুফ জামানের মেয়ে শবনম জামান ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন:তিনি লিখেছেন, ‘আমার বাবা সাড়ে ১৫ মাস বা ৪৬৭ দিন পর ফিরে এসেছেন। আমি ও আমার বোন কৃতজ্ঞ তাদের কাছে, যারা এই সময় আমাদের সহযোগিতা করেছেন।এ ক্ষত কাটিয়ে উঠতে আমরা এখন গোপনীয়তা বজায় রাখতে চাই। এ বিষয়ে আর কিছু না জানতে চাইতে সবাইকে অনুরোধ করছি।’

যেমনটা বলছিলাম- আসলে মারুফের কি ঘটেছিলো সেটা হয়তোবা আর জানার সুযোগ মিলবেনা। যখনি গোপন বন্দিদশা থেকে কাউকে মুক্তি দেয়া হয় তখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা তাকে এমনভাবে ভীত করে হুমকি দেয় যে তার কি ঘটেছিলো সেটা নিয়ে আর ভয়ে মুখ খুলেনা।

ভিন্নমত দমন আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নানান কৌশল অবলম্বন করে সরকার। তারি একটা কৌশল হলো জোরপূর্বক গুম করা এবং গোপন কারাগারে আটকে রাখা। রাজনীতির বিরোধী মতের যারা তাদের মধ্যে বিষয়টি ভয় আর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ এখন যেটা দেখতে পাচ্ছে সেটা হলো- যে কাউকে উঠিয়ে নেয়া হতে পারে, গুম করা হতে পারে, তাতে কার্যত কারোরি করার কিছু নেই। আর গুমের এমন সব রুটিনতর ঘটনায় আদালতের নজরদারিতে একরকম অনীহা দেখা যাচ্ছে।

২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তখন গুমের ঘটনা ঘটেছিলো ৩টি। ২০১৭ সালে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৯০ তে। যে তথ্যটা দেয়া হলো সেটা শুধু গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে।এছাড়াও আরো অনেক গুমের ঘটনা আছে যেগুলো শুধু ভুক্তভোগী পরিবার জানে।

মারুফের মতো অন্যরাও ফিরে আসুক এ আশা করি এবং প্রত্যাশা করি গোপন কারাগার নামে যেনাে আর কিছু না থাকে।

জিএস/