ওয়াশিংটন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে শহীদুল আলম

‘বাংলাদেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে ক্ষমতাসীনরা'

‘বাংলাদেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে ক্ষমতাসীনরা'

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার দেশটিতে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। আর তাতে আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

ওয়াশিংটন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন খ্যাতিমান লেখক ও আলোকচিত্রী শহীদুল আলম। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফ্রিডম কমিটি আয়োজিত ন্যাশনাল প্রেসক্লাব বোর্ড অব গভর্ণনেন্স’র ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস আল ফারুকের সঞ্চলনায় এতে সভাপতিত্ত্ব করেন কমিটির চেয়ারম্যান সাংবাদিক জন ডনেলি। এতে অন্যান্যের অংশ নেন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সাংবাদিক মেরন বিলকাইন্ড, রাষ্ট্রদূত উইলাম বি মাইলাম, প্রেসক্লাবের সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারী, রাচেল ওসওয়ার্ল্ড, উইলিয়াম ম্যাকক্যারন প্রমুখ।

২০১৮ সালের আগস্ট মাসে বাসা থেকে শহীদুল আলমকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। কারাগারে আটক ছিলেন ১০০ দিনেরও বেশী, আটক করার পর মাধররও করা হয়েছিলো দেশে বিদেশে খ্যাতিমান এই আলোকচিত্রী সাংবাদিককে।

কারাগারের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে শহীদুল জানান কারাগারে আটক থাকা অবস্থায়ও তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। নিজের গ্রেফতার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে শহীদুল আলম বলেন, “একটা বিষয় নিয়ে আমরা খুবি উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলাম।একের পর এক অসংখ্য লোক গুম হচ্ছে, এর মধ্য থেকে যারা বের হয়ে আসতেছে তারা এটা নিয়ে আর মুখ খুলছেনা। এর মধ্য আমাদের কিছু বন্ধু-বান্ধব রয়েছে। এর কারণটা কী তা আমরা উদঘাটন করতে চেয়েছিলাম। আমি এবং এক সহকর্মী মিলে ঠিক করলাম বিষয়টা নিয়ে আমরা কাজ করবো। মানুষ গুম হবার পর তাদের সঙ্গে কী ঘটে সেটা কারণ উদঘাটন করার চেষ্টা করবো। আমি এটা ভাবতেই পারিনি যে আমি নিজে তার গিনিপিগ সাজতে যাচ্ছি, বিষয়টি আমার সঙ্গেই ঘটবে।”

তিনি বলেন, “সে সময়টাতে সড়ক দুর্ঘটনায় লোকজন প্রাণ হারাচ্ছিলো। আর তার প্রতিবাদে অগণিত ছাত্ররা রাজপথের বিক্ষোভে নেমে আসে। আল-জাজিরার এক সাংবাদিক আমার কাছে জানতে চান-সড়ক দুর্ঘটনার নিয়ে এরকম ক্ষোভের কারণটা কী? এর পেছেনে (ক্ষোভ) যে কারণটা ছিলো তা শুধুই সড়ক দুর্ঘটনা ছিলোনা। দেশে যা ঘটছিলো তার সব কিছু নিয়ে মানুষের মনের ভেতর অসংখ্য ক্ষোভ পুঞ্জিভূত ছিলো। আর এটাই ছিলো আসল বিষয় যা এ ক্ষোভের (সড়ক আন্দোলন) ভিতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এরি ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় আন্দোলনে নেমে আসে।”

সরকার আন্দোলনকারীদের উপর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের লেলিয়ে দেয় মন্তব্য করে শহীদুল বলেন, “ ৪ আগস্ট। যেদিন আমি ছবি তোলতে গেলাম আমার উপর হামলা করা হলো, আমার ক্যামেরার সরঞ্জামাদি চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হলো।এমনকি আমাকের মারধর করা হলো। সরকার সে সময়টাতে যা করেছিলো সেটা হলো- তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের লেলিয়ে দেয়া হলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করার জন্য। আমি এসব ঘটনারই ছবি তুলছিলাম। আর তাতেই তারা (সরকার) অসস্তিতে পড়ে যায়।”

তিনি বলেন, “পরদিন আমি আবারো মাঠে নামি। ফেসবুক লাইভে এসে যা ঘটছিলো তা প্রচার করি।এর পর আল-জাজিরায় একটা সাক্ষাতকার দিয়েছিলাম। সাক্ষাতকার দেবার পর আমি তা আপলোড করছিলাম। সে মুহুর্তে পরদিন আরেকটি সাক্ষাতকার দেবার জন্য বিবিসির এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তখনি দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো। বাসায় তখন একা। দরজায় ছিদ্র দিয়ে দেখলাম- মাথার চুল খাটো করা এক তরুণী মহিলা আমাকে ডাকছে---আংকেল শহীদুল, যেমনটা আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে ডেকে থাকেন। যখন দরজা খুললাম দেখলাম পেছন থেকে অনেক লোক বের হয়ে আসলো। তারা সংখ্যায় ছিলো বিশাল। কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা আঁচ করতে পারলাম।”

তারপরের অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিলো?- এমন প্রশ্নের জবাবে খ্যাতিমান এই আলোকচিত্রী বলেন, “আমি প্রথম খেয়াল যেটা ছিলো সেটা হলো-তারা (আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী) আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এটা মানুষজনকে জানান দেয়া। তারা যদি চুপচাপ আমাকে ধরে নিয়ে যায় তাহলে কেউ জানতে পারবেনা কী ঘটেছে। লোকজন শুধু বাসায় এসে দেখবে আমি সেখানে আর নেই। এর মধ্যে বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেলাে। এই কয়েকটা মিনিট ছিলো খুবি কঠিন একটা মুহূর্ত। আর তাই আমি চিৎকার করলাম, প্রতিবাদ জানালাম, অন্যদের মনযোগ আকর্ষণ করার জন্য যতটুকু করা যায় আমি তাই করার চেষ্টা করলাম। আমার এসব করার কারণে তারা (আইনশৃঙ্খলাবাহিনী) দেরী করেনি কিংবা তাদের কাজ থামিয়ে রাখেনি। আমার এসব করার কারণে অন্যরা সতর্ক হয়েছিলো, তারা বুঝতে পেরেছিলো কিছু একটা ঘটেছে। যখন তারা নীচে আসলো ততক্ষণে আমাকে তুলে নেয়া হলো। আমি ছিলাম হাতকড়া পরিহিত আর চোখ বাঁধা অবস্থায়। যেটা করতে চেয়েছিলাম সেটা কাজে দিয়েছিলো। আমাকে নিয়ে যাবার খবরটা দ্রুত চারপাশে জানাজানি হয়ে গিয়েছিলো।”

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত বছরের নভেম্বরে কারাগার থেকে শহীদুলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। কিন্তু এখনো তাঁর মামলা ঝুলে আছে, আগামী সোমবার একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশব্যাপী চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে আল-জাজিরায় একটি সাক্ষাতকার দেবার পরই শহীদুল আলমকে আটক করা হয়। সরকার দলীয় কর্মী-সমর্থকরা আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালানোনর প্রেক্ষিতে আন্দোলনটি তখন সহিংসতায় রুপ নিয়েছিলো।

আন্দোলন প্রসঙ্গে শহীদুল আলম বলেন, “শিক্ষার্থীরা যা করছিলো সে জন্য সরকারের উচিত ছিলো তাদেরকে সাধুবাদ জানানো। তা না করে সরকার উল্টাে তার বাহিনীকে শিক্ষার্থীদের উপর লেলিয়ে দিয়েছে।"

সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকা এবং স্পষ্টভাষী হবার কারণে প্রায়ই সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে তাঁকে।

নিজের অবস্থানের কথা জানান দিয়ে অনুষ্ঠানে শহীদুল আলম বলেন, “আমার একটা পক্ষ আছে। আর সেটা হলো আমি কখনো শোষকদের পক্ষে নই।”

তিনি বলেন, “যাদের আকাঙ্খা মরে গেছে তাদের থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা উচিত না।”

শহীদুল বলেন, “আমার ফেসবুক পোস্টে লাইক এবং শেয়ার দেবার কারণেও কারাগারে অনেক সাংবাদিক এবং সমাজকর্মী আটক রাখা হয়েছে, আর তাতে বাদ জাননি সাধারণ মানুষরাও।”

ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছেন শহীদুল আলম। সেজন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সহযোগিতাও কামনা করেছেন তিনি। শহীদুল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার পরিস্থিতি ইস্যুর সমালোচনা করে সরকারকে বিশ্বাসযোগ্য বলেনি।"

যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইবেন কী না এমন এক প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত এই আলোকচিত্রী বলেন, “আশ্রয় চাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের সংবিধান আমাকে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার দিয়েছে। দেশের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ব্যক্তিগত যত শংকা আর বাধা আসুক না কেনো জীবন থাকতে আমি আমার সংবিধান প্রদত্ত অধিকার চর্চা থেকে বিচ্যুত হবো না।”

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্রমঅবনতি, অব্যাহত গুমের ভয়াবহতা, গণমাধ্যমের সরকারের লেজুড়বৃত্তিসহ নানান প্রসঙ্গে কথা বলেন টাইম ম্যাগজিনের বর্ষসেরা এই ব্যক্তিত্ব। কথা হয় আলোকচিত্র আর তার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও।