মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগ নিয়ে সতর্ক জাতিসংঘ; অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাদ দেয়া হবে, বললেন ডোজারিক

মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগ নিয়ে সতর্ক জাতিসংঘ; অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাদ দেয়া হবে, বললেন ডোজারিক Photo: UN

মুশফিকুল ফজল আনসারী, জাতিসংঘ সংবাদদাতা

চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। গত বছরের পর এবারও বাংলাদেশে চরম মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে জাতিসংঘ। বুধবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ বলেছে তাদের অবস্থান খুব স্পষ্ট। শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগপ্রাপ্তরা যেনো সততা এবং দক্ষতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় তা নিশ্চিতে জাতিসংঘ মহাসচিব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্থোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র ডোজারিক বলেছেন, শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিতদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মিশন থেকে বাদ দেয়া হবে।

ব্রিফিংয়ে ডয়েচে ভেলের রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘের স্থায়ী সংবাদদাতা মুশফিকুল ফজল আনসারী জানতে চান, "ডয়চে ভেলের সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্যাতন এবং বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডসহ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন জড়িতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তাদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ এবং শ্রীলংকা। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত অসংখ্য কর্মকর্তাকে শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে পুরস্কার স্বরুপ এদের অনেককে পাঠায় সরকার। জাতিসংঘ মহাসচিব কী এ বিষয়ে অবগত?"

জবাবে ডোজারিক বলেন, "হ্যাঁ। ডয়চে ভেলের ডকুমেন্টারি আমরা দেখেছি। আপনি হয়তো জানেন যে, শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের সহকর্মীরা এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা রিপোর্ট নিয়ে (খবর প্রকাশকারী মিডিয়াকে) জাতিসংঘের তরফে বিবৃতি দিয়েছেন।"

তিনি বলেন, "আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই যে, শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেনো দক্ষতা এবং সততার সর্বোচ্চ মানদন্ড নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব প্রতিশ্রুতবদ্ধ। এ প্রতিশ্রুতির মধ্যে আরও রয়েছে, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিশ্রুতি, জাতিসংঘের মানবাধিকার যাচাই পদ্ধতির অধীনে শান্তিরক্ষী নিয়োগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ নিয়ম এবং কৌশল মেনে চলা।"

এরপর একই বিষয়ে এই প্রতিবেদক জানতে চান, "শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মকর্তা নিয়োগের সময় স্বাগতিক দেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে। কিন্তু যে দেশ শান্তিরক্ষা মিশনে লোক পাঠাবে সে দেশের সরকার যদি নিজেই চরম পর্যায়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী হয় তাহলে এ বাছাই প্রক্রিয়া কীভাবে স্বচ্ছ হবে?"

জবাবে মুখপাত্র ডোজারিক বলেন, "আমরা বাছাই প্রক্রিয়া তিন ধাপে সম্পন্ন করি। প্রথম পর্যায়ে বাছাই হয় ব্যক্তিগত মানদণ্ডে, পরের ধাপে বাছাই কাজটা করে স্বাগতিক দেশ এবং অন্য বাছাই প্রক্রিয়াটা হয় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস থেকে।"

তিনি বলেন, "আপনাকে বলবো, বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, খুব অল্প সংখ্যক দেশ থেকে শান্তিরক্ষীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে অভিযোগ পেয়েছি। যখনি এ ধরনের ঘটনা ঘটে তখনি আমাদের শান্তিরক্ষা মিশনের সহকর্মীরা যাচাই-বাছাই নীতি, কর্ম কৌশল অনুসারে শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশের সঙ্গে কথা বলে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন। এধরনের ঘটনার (মানবাধিকার লঙ্ঘন) কারণে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া জড়িত কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল হতে পারে। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের মিশন থেকে সরিয়ে দেয়া হবে।"

উল্লেখ্য, গত ২১ মে "মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীরা যখন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী" শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ডয়চে ভেলে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, "বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠিয়েছে। ডিডাব্লিউ, নেত্র নিউজ এবং স্যুডডয়চে সাইটুং এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য। জাতিসংঘ দৃশ্যত বিষয়টি উপেক্ষা করছে।"

গত বছর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে ডিডাব্লিউ এবং নেত্র নিউজ উন্মোচন করে যে ব়্যাব নির্যাতন, হত্যা এবং অপহরণের সঙ্গে যুক্ত এবং এসব অপরাধ ঢাকতে বাহিনীটি অনেককিছু করে। তাদের টার্গেট: সন্দেহভাজন অপরাধী, বিরোধী দলীয় কর্মী, এবং মানবাধিকার রক্ষকরা। ব়্যাবের সদস্যরা আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ের সহায়তায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে জানিয়েছেন দুইজন হুইসেলব্লোয়ার।

এমআর/