বাংলাদেশে নির্যাতনে জড়িত পুলিশ, অন্যান্য বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া বন্ধ করতে হবে: সরকারকে অ্যামনেস্টি

বাংলাদেশে নির্যাতনে জড়িত পুলিশ, অন্যান্য বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া বন্ধ করতে হবে: সরকারকে অ্যামনেস্টি

বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই নির্যাতন এবং অন্যান্য অন্যায় আচরণের সঙ্গে জড়িত পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

নির্যাতনের শিকারদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী সনদে ১৯৯৮ সালে স্বাক্ষর করেছে এবং দেশটিতে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ থাকলেও এক দশকেরও বেশী সময় ধরে এই আইনে মাত্র একটি বিচার হয়েছে। বাংলাদেশে পুলিশ এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অব্যাহতভাবে দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

গত ৩ জুন যশোরের অভয়নগরে পুলিশ হেফাজতে আফরোজা বেগমের মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে।

এতে বলা হয়, আফরোজা বেগমের ছেলে আরিফ হোসেন মুন্না অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে বলেন, "বাড়িতে অভিযান পরিচালনার আগে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবারকে হয়রানি করে আসছিলো।"

তিনি বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে চাঁদার জন্য হয়রানি করে আসা দুই পুলিশ কর্মকতা একজন পরিচিত মাদক ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে মধ্য রাতে জোরপূর্বক আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। বাবাকে বাড়িতে না পেয়ে পুলিশ আমার মায়ের শরীরে তল্লাশি চালায়, ফ্যানের সাথে তার চুল বেঁধে অনবরত চড়-থাপ্পড় মারছিলো।"

"এরপর তারা মায়ের কাছ থেকে এক লাখ ৮৮ হাজার টাকা জব্দ করে, মাকে গ্রেফতারে আগে মাদক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে ৩০ টি ইয়াবা বড়ি নিয়ে সেগুলো মায়ের হাতে ধরিয়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে যেন নির্যাতন এবং চুরির মামলা না করা যায় সেজন্য তারা আমার চোখের সামনেই মায়ের হাতে ইয়াবা বড়ি ধরিয়ে দেয়।"

মুন্না বলেন, সকালে থানায় তার মাকে খাবার এবং ঔষুধ দিতে গেলে পুলিশ তা করতে দেয়নি। পুলিশের নির্যাতন এবং নিষ্ঠুরতার জন্যই তার মার মৃত্যু হয়েছে বলে জানান মুন্না। তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করলে হত্যা করা হবে বলে তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। 

মুন্না বলেন, "১০ জুন আমার ছোট ভাই স্কুলে যাবার সময় ঐ মাদক ব্যবসায়ী হুমকি দিয়ে বলেন, "তোমার পরিবার যদি মামলা করার সাহস দেখায় তাহলে তোমার মায়ের মতো আমরা তুমাকেও হত্যা করবো।""

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গবেষক তকবির হুদা বলেছেন, "নির্যাতন এবং অন্যান্য অন্যায় আচরণ ঘৃণিত বিষয় এবং এগুলো মেনে নেওয়া যায়না। ব্যাপক এবং অব্যাহত নির্যাতন এবং অন্যান্য অন্যায় আচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই সম্পূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। ন্যায় বিচারের মাধ্যমে সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যে সমস্ত কর্মকর্তারা ক্ষতি করতে পারে এমন আশংকা রয়েছে তাদেরকে তদন্ত শেষ হবার পূর্ব পর্যন্ত তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করতে হবে। এতে করে তারা আর কোনো নিয়ম ভঙ্গে জড়িত হতে পারবেনা।"

তিনি বলেন, "বিগত এক দশকেরও বেশী সময়ে কারা হেফাজতে অসংখ্য মৃত্যুর রিপোর্ট থাকার পরও বাংলাদেশের আইনে মাত্র একটি ঘটনার বিচার হলো, এটাতো প্রতিষ্ঠিত দায়মুক্তির বিপরীতে নিন্দনীয় একটি বিচার।"

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বলেছে যে, হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর অধীনে এখন পর্যন্ত ২৪ টি মামলা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে,  আশংকাজনকভাবে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মিডিয়ার বরাত দিয়ে সংস্থাটি বলছে, একই সময়ের ব্যবধানে কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৯২৩ জনের।