আদাবরে ভবন দখলচেষ্টা: দেড় বছরে দেড় কোটি টাকা আদায় করেছিল একই দখলদার গ্রুপ

আদাবরে ভবন দখলচেষ্টা: দেড় বছরে দেড় কোটি টাকা আদায় করেছিল একই দখলদার গ্রুপ

রাজধানীর আদাবরে একটি চক্রের বিরুদ্ধে শনিবার ভোরে একটি বহুতল ভবন দখলচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই চক্র আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের ৬ নম্বর রোডের ৪১-৪২ নম্বর প্লটের ওই ভবনটি গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় দেড় বছর দখলে রেখেছিল।

গতকাল শনিবার ভোরে ওই দখলচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভবনের মালিক ব্যবসায়ী মো. আমিনুর রহমান খান আদাবর থানায় মামলা করেছেন।

আজ রোববার আদাবর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, শনিবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে রামদা ও বিভিন্ন অস্ত্রসহ ১৫-২০ জনের একটি দল ভবনর দখল নেওয়ার উদ্দেশে হামলা চালায়।

সেসময়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা কয়েকজন বাইরে থেকে গেট খুলে দিতে বলে। ভেতরে থাকা লোকজন গেট খুলতে না চাওয়ায় তারা গেট ও জানালা ভাঙচুরের চেষ্টা করে।

আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, লাল টি-শার্ট পরা একজন কোমর থেকে রামদা বের করে গেটের দিকে এগিয়ে যায় এবং বারবার কোপাতে থাকে। এরপর তিনি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুরের চেষ্টা করে।

পরে রামদা হাতে আরেকজন তার সঙ্গে যোগ দেয়। দুজন মিলে গেট ও জানালায় হামলা চালায়, আরেকজন সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে ইট ছুড়ে ভেঙে ফেলে।

ভবন মালিকের অভিযোগ, একই চক্র ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে প্রায় দেড় বছর ভবনটি তাদের দখলে নিয়ে রেখেছিল।

চলতি বছরের মার্চে চক্রের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে মূল মালিকের কাছে ভবনের দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

গতকাল ভোরে হামলার সময় ভেতরে থাকা ভবনের ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, চক্রটি প্রথমে চাঁদা দাবি করে এবং তাদের গেট খুলে দিতে বলে।

'তারা প্রথমে বলে, টাকা দে। বাড়িতে থাকবি আর টাকা দিবি না? একপর্যায়ে তারা আমাদের গেট খুলতে বলে। আমরা খুলিনি। তখন তারা মূল গেটে কোপাতে শুরু করে,' বলেন তিনি।

ফরহাদ জানান, ভেতরে ঢুকতে না পেরে হামলাকারীরা যাওয়ার আগে কয়েকটি জানালার কাঁচ ভাঙচুর করে।

'সেসময় আমি ৯৯৯ নম্বরে কল করি। কিন্তু পুলিশ প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়,' বলেন তিনি।

ভবন মালিকের করা মামলায় খুরশীদ আলম খানসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভবন মালিকের এক স্বজন জানান, খুরশীদ ওই এলাকার প্রভাবশালী লোক। আমিনুর মোহাম্মদপুরে আরেকটি ভবনে থাকায় তারা এই ভবন দখলের টার্গেট করে।

তিনি বলেন, '২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই চক্রটি ভবনটি দখল করেছিল। সেসময় আমিনুরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা আছে এমন অভিযোগ তুলে ভাড়াটিয়াদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছিল।'

আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমিনুরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন ওই স্বজন।

মামলায় বলা হয়, আসামিদের একজনের কাছে পিস্তল ছিল। তারা ভেতরের লোকজনদের গেট খুলে ভবন ছেড়ে চলে যেতে বলে। এতে রাজি না হওয়ায় রামদা দিয়ে গেটে হামলা চালানো হয় এবং জানালায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।

আমিনুর অভিযোগ করেন, চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ভবনটি আবার দখল করতেই শনিবার এই হামলা চালানো হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, ১০ কাঠার এই জমিটি আমিনুর ও তার বড় বোন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। ভবন নির্মাণের পর ২৪ বছর ধরে তারা এটির দখলে ছিলেন।

আমিনুরের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট কেয়ারটেকার ও নিরাপত্তাপ্রহরীকে মারধর এবং ভেতরের লোকজনকে হুমকি দিয়ে এই চক্র জোর করে ভবনে ঢুকে পড়ে।

পরে পুলিশের তদন্তে দেখা যায়, তারা হুমকি দিয়ে ভাড়াটিয়াদের বের করে দিয়ে নিজেদের কেয়ারটেকার ও নিরাপত্তাপ্রহরী বসিয়ে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

তদন্তকারীরা জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভবনটি দখলে রেখে খুরশীদের নেতৃত্বে এই চক্র ৪৪ ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি আদায় করেছে।

দখলের ঘটনায় আদালতে মামলা করা হলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত পরিচালনা করে।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৪ মার্চ পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে।

আমিনুর জানান, এরপর ভবনটির দখল তাকে ও তার বোনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এবারের মামলায় তিনি বলেন, আসামিরা আগের মামলা প্রত্যাহার ও ভবন ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দিতে থাকে এবং চাঁদা দাবি করে। দাবি না মানায় শনিবার ভোরে হামলা করা হয়।

আদাবর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম জানান, ভবনটি আগে থেকেই দখলের টার্গেটে ছিল।

তিনি বলেন, 'খুরশীদ একবার বাড়িটি দখলে নিয়েছিলেন। পরে বর্তমান মালিক দখল ফেরত পান। এ নিয়ে একটি মামলা চলমান রয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।'