লাভের টাকায় তিতাসের প্রকল্পের বাহার

লাভের টাকায় তিতাসের প্রকল্পের বাহার

বিপুল আর্থিক সংকটের বিষয়টি সামনে এনে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। অথচ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে আগামী তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য ৪ হাজার ১১০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গ্যাসের দাম বাড়িয়ে নিজস্ব অর্থায়নে বড় বড় প্রকল্প নিয়ে থাকাকে দ্বিমুখী আচরণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নীতিমালা অনুযায়ী, কোনও প্রতিষ্ঠানের জন্য বছরে যত রাজস্ব প্রয়োজন সেই অনুযায়ী এর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়। কিন্তু দেখা যায়, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি করে দাম বাড়ানোর কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর থলেতে জমা হয় বিপুল অর্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে মধ্যেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে নেয়। সেক্ষেত্রে কোনও প্রতিষ্ঠানই লোকসান বহন করতে চায় না। দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে একই চিত্র।

সূত্র বলছে, তিতাস এক লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপন করছে। ২০২১ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হবে এ বছরের ডিসেম্বরে। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬৯ কোটি টাকা, এর পুরোটাই প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অর্থায়ন।

গত জুলাইয়ে তিতাসের আরও একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তিতাস এলাকার প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন এবং বিতরণ ক্ষমতা উন্নয়নের জন্য ৮৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে এটি হাতে নেওয়া হয়। এ প্রকল্প শেষ হতে পারে ২০২৪-এর জুনে।

গত জানুয়ারিতে তিতাস নিজস্ব অর্থায়নে আরও তিনটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরমধ্যে ৬৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে হবে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ গ্যাস নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপন। এছাড়া জয়দেবপুর-এলেঙ্গা চার লেন মহাসড়ক বরাবর বিদ্যমান গ্যাস নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপনে খরচ হবে ৭৫৮ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার বিদ্যমান গ্যাস নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে মানুষ ঠিকঠাক গ্যাস পাবে বলে তিতাসের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। সব প্রকল্পই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এবার আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু আপদকালীন লাভের অঙ্ক থেকে খানিকটা ভর্তুকি দিলেই গ্যাসের দাম না বাড়ালেও চলতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তেলের দাম বাড়ানোর সময়ও জ্বালানি বিভাগের তরফ থেকে বলা হয়েছে, দাম না বাড়ানো হলে বিপিসির চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে। এ নিয়ে দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বারবার কমিশনের গণশুনানিতে অভিযোগ করেন। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের দেওয়া অর্থে যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে তার সুফল জনগণের পাওয়া উচিত। কিন্তু সেটা কেউ পায় না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম মনে করেন, তিতাসের গ্যাসের দামের সঙ্গে তাদের লোকসানের কোনও সম্পর্ক নেই। তার দৃষ্টিতে, পেট্রোবাংলার গ্যাসের দামের ওপর তাদের গ্যাসের দাম নির্ভর করে। পেট্রোবাংলা বেশি দামে গ্যাস কিনে বিক্রি করে।

এদিকে গ্যাসের দামের পাশাপাশি তারা তাদের বিতরণ চার্জও বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলমের মতে, ‘তিতাসের বিতরণ মার্জিন ৫ পয়সা হলেই হয়। কিন্তু সেখানে বিইআরসি আগে থেকেই ২৫ পয়সা দিচ্ছে। এতে করে প্রতি মাসে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা তিতাসের ভাণ্ডারে জমা পড়ছে। এখান থেকে তারা অংশীজনদের ডিভিডেন্ড ও সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছে। তারপরও তাদের কোষাগারে টাকা থাকছে। ফলে জমানো টাকা দিয়েই তাদের প্রকল্প করা উচিত। একইসঙ্গে বিতরণ চার্জও বাড়ানোর প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। নিজের টাকায় প্রকল্প করতে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টির দ্বিমুখী আচরণের অবসান হওয়া প্রয়োজন।’