রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. জাওয়াদুল হককে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার সকালে সাড়ে ১১টার দিকে রামেবির অস্থায়ী কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিকেলে গেস্ট হাউসের সামনে সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বর্ণনা দেন উপাচার্য।
অধ্যাপক জাওয়াদুল হক বলেন, কার্যালয়ের বাইরে স্লোগানের শব্দ শুনতে পান তিনি। কিছুক্ষণ পর পিয়নদের ধাক্কাধাক্কি করে ২০ থেকে ২৫ জন তার কক্ষে ঢুকে পড়েন।
তাকে চেয়ার থেকে উঠে যেতে বলা হয় এবং আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে রাজশাহীর মানুষকে কাজ না দেওয়া এবং ঢাকার মানুষকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয় বলে দাবি করেন উপাচার্য।
এরপর একজন তার সামনে একটি ছাপানো কাগজ দেন। কাগজটি তিনি পড়তে চাইলে বলা হয়, পড়ার দরকার নেই, সই করতে হবে।
এ সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাজমুল হোসাইন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলে অভিযোগ করেন জাওয়াদুল হক।
স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানান, ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ নামক ব্যানারে বেশ কিছু ব্যক্তি এই ঘটনা ঘটিয়েছেন।
এই ব্যানারে লেখা রয়েছে, “রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী দোসর ভিসি প্রফেসর ডা. মো. জাওয়াদুল হকের পদত্যাগের দাবিতে, ভিসি ঘেরাও কর্মসূচি।”
সকালে প্রথমে তারা ক্যাম্পাসে মিছিল ও সমাবেশ করে এবং পরে উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে নিজেদের নিয়ে যাওয়া পদত্যাগপত্রে তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরফুজ্জামান শামীমের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে আসে। তাদের সঙ্গে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিটের সভাপতি আল মোস্তাক শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল, জিয়া মঞ্চের সভাপতি বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক লাল্টু ছিলেন।
এ বিষয়ে আজ সন্ধ্যা সাতটার দিকে শরফুদ্দিন শামীম বলেন, তিনি মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন। তবে উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ সঠিক নয়। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আগে কয়েকবার মানববন্ধন হয়েছে। উপাচার্যকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অবহিত করাই আজ তাদের উদ্দেশ্য ছিল। তাদের সঙ্গে রাজপাড়া থানা বিএনপিসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ ছিলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে উপাচার্য জাওয়াদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তারা খুব আগ্রাসীভাবে আমার রুমে ঢুকে পড়ে। বলে, “আপনি, আওয়ামী লীগের দোসর, আপনি রাজশাহীর মানুষকে কাজ দেন না, ঢাকার মানুষ কাজ করে। আপনি এই চেয়ারে থাকবেন না।” আমি একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা আরও বলে, “আপনি চেয়ার থেকে ওঠেন এবং আপনি এই মুহূর্তে বের হয়ে যান। আপনাকে এই চেয়ারে আর দেখতে চাই না।”’
উপাচার্য বলেন, ‘এরপর একজন সামনে একটি কাগজ এগিয়ে দেন। আমি বললাম, কী কাগজ? কাগজটা দেখার দরকার আছে। তারা বলল, “আপনার দেখার দরকার নাই, আপনি সই করেন। ওই সময় আমার পিএসও সেখানে ছিলেন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।’
পরিস্থিতি দেখে ভয় পেয়েছিলেন জানিয়ে উপাচার্য বলেন, কাগজে সই না করলে তাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হতে পারে বলে তার আশঙ্কা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সই না করলে আমিও ফিজিক্যালি অ্যাসল্টের সম্মুখীন হতে পারি। আর তাদের সামনে দেওয়া কাগজটা প্রিন্টেড একটা কাগজ ছিল। আমাকে পড়ারও সুযোগ দেয়নি। তবে আমার কাছে মনে হলো যে একটা পদত্যাগপত্রই ছিল। ওপরে পদত্যাগপত্র, এ রকম একটা শব্দ আমার কাছে মনে হয়েছে। আমাকে পুরোটা পড়তে দেয়নি।’
সই করার পর ওই লোকজন কাগজটি নিয়ে তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দেন বলে জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমি সই করে দিলে তারা কাগজটা নিয়ে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। তারা বলে, “আপনি এখন চলে যাবেন, এখানে দাঁড়াবেন না।” এ সময় আমার মুঠোফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি ফেরত দেওয়া হয়।’
জাওয়াদুল হক জানান, কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তার অফিসের কম্পিউটারের সিপিইউ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও বিদ্যুতের সংযোগও নষ্ট করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন দপ্তরে তালা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবকে বিষয়টি জানিয়েছেন বলে জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা চলছে। এসব বিষয়ে যদি দ্রুত একটা সমাধান তারা না দেন, তাহলে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম—একাডেমিক বলেন, প্রশাসনিক বলেন, আমাদের যে প্রকল্পের কাজগুলো চলছে, সেগুলো কিন্তু স্থবির হয়ে পড়বে।’
ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের সবাইকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না বলে জানান উপাচার্য। তবে সেখানে কৃষক দলের কেউ ছিলেন বলে জানান। এর আগে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করা একটি গোষ্ঠী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে তার ধারণা। উপাচার্য বলেন, ‘এটা অবশ্যই তদন্ত করে বের করতে হবে। যে গ্রুপটা আসছে, তাদের বিভিন্ন ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এটা তো দেখলেই আইডেন্টিফাই করা যাবে।’
উপাচার্য বলেন, তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিজে নিজে লোক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সত্য নয়। কার্যালয়ে ভাঙচুর, মালামাল নিয়ে যাওয়া ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হবে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় উপাচার্যের পিএস ও সেকশন অফিসার (অর্থ) নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘আমাকে তারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। আমার শার্টের বোতাম ছিঁড়ে দিয়েছে। আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। আমাকে ও ভিসি স্যারকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে তারা।’